অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে অনবদ্য সাংবাদিকতা
ইন্টারনেট বন্ধ, তবু থামেনি সত্য। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রাবাড়ির ইমাম হাসান তাইম হত্যার দৃশ্য আর ঐতিহাসিক ৯ দফা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে সংবাদকর্মীরা — জেনে নিন সেই অজানা গল্প এই রিপোর্টে।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ পড়ে দীর্ঘতম ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যে। তবু জুলাই হত্যাযজ্ঞের খবর ঠিক কীভাবে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল? আসলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী সেসময় বিকল্প উপায়ে তথ্য-উপাত্ত বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিয়েছিলেন। ইন্টারনেটবিহীন বাংলাদেশ থেকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে যাত্রাবাড়ির ইমাম হাসান তাইম হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য। হাতে-কলমে প্রতিটি গণমাধ্যম অফিসে পৌঁছে দেওয়া হয় জুলাই অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ৯ দফা।
During the July Uprising, Bangladesh endured its longest-ever internet blackout. So how did news of the killings still reach the world? A handful of journalists risked their lives to smuggle it out. They carried the historic nine-point demands from newsroom to newsroom by hand, and sent footage of Imam Hasan Taim’s murder in Jatrabari around the world.
২০২৪ সালের জুলাই মাস। কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন রূপ নিচ্ছে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। ঠিক তখনই শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এক অস্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। 'ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট'। পুরো দেশ একটি ডিজিটাল কারাগারে পরিণত হয়। ইতিহাসের পাতায় যা পরে জায়গা করে নেয় 'দ্য লঙ্গেস্ট সাইলেন্স' বা দীর্ঘতম নীরবতা নামে।
১৮ জুলাই দুপুরের পর হঠাৎ করেই ঘটে সেই ব্ল্যাকআউটের ঘটনা। দেশের কোটি কোটি মানুষের হাতের মোবাইল স্ক্রিন থেকে উধাও হয়ে গেল ৪জি সিগন্যাল। যোগাযোগের শেষ ভরসা হয়ে টিকে ছিল ব্রডব্যান্ড লাইন। কিন্তু রাতের ঠিক ৯টা বাজতেই পুরো দেশ যেন এক নিমিষে ডুবে গেল অতল অন্ধকারে। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক থেকে। টানা ৫ দিন দুনিয়ার সাথে বাংলাদেশের কোনো ডিজিটাল যোগাযোগ ছিল না। ২৪ জুলাই রাতে ধীরগতির ব্রডব্যান্ড এবং ২৮ জুলাই মোবাইল ডেটা ফিরলেও লোহার মতো দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছিল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। এরপর ৪ আগস্ট ২০২৪-এ আসে দ্বিতীয় ধাক্কা। অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে আবারও নেমে আসে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট।
ইন্টারনেট ব্লাকআউটের সে দিনগুলোতে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় সাংবাদিকরা বাধ্য হয়ে আধুনিক যুগ থেকে অনেকটা পুরোনো প্রযুক্তিতে ফিরে যান। ইন্টারনেটভিত্তিক সরাসরি সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায়, তারা সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভয়েস কলের মাধ্যমে স্টুডিওর সাথে যুক্ত হতেন। ফোনোলাইভ দিয়ে ঘটনাস্থলের সর্বশেষ খবরাখবর অফিসে পৌঁছাতেন। এরমধ্যে নানা বিকল্প রাস্তায় বিশ্বের সাথে বাংলাদেশকে যু্ক্ত করেছেন সাংবাদিকরা। বাংলাদেশে কর্মরত দেশি-বিদেশী গণমাধ্যমে কর্মরত বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী দি ইনসাইটাকে দেয়া সাক্ষাতকারে তুলে ধরেছেন সেসময়কার সাংবাদিকতার কঠিন অভিজ্ঞতাগুলো।
ঝুঁকি নিয়ে তথ্য ও ফুটেজ আদান-প্রদান
তুর্কিয়ে-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ছিলেন কামরুজ্জামান বাবলু। নিজের সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন দি ইনসাইটার সাথে একান্ত আলাপচারিতায়। আন্দোলনের সময় চারদিকের সহিংসতা, মানুষের মৃত্যু এবং অনবরত গুলির ঘটনার মধ্যে প্রতিনিয়ত তাকে মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। জুলাই অভুত্থানের অভিজ্ঞতাকে তার জীবনের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
তিনি বলেন, একদিকে দ্রুত খবর পাঠানোর তীব্র মানসিক চাপ, অন্যদিকে সম্পূর্ণ ইন্টারনেটবিহীন এক ব্ল্যাকআউট পরিস্থিতি পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছিল। ফেসবুকসহ সব ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ থাকায় দেশের বাইরে খবর পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার সরকারের উপস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও রিকশাআরোহীদের থামিয়ে মোবাইল ফোন চেক করার দৃশ্য সচক্ষে দেখেছেন কামরুজ্জামান বাবলু। দি ইনসাইটাকে তিনি জানান, ফোনের ভেতর জুলাই আন্দোলনের কোনো ছবি বা ফুটেজ পেলেই নির্বিচারে গ্রেফতার করা হতো। এই চরম নজরদারির মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে অনেক ভিডিও বা ফুটেজ সংগ্রহ করলেও, ইন্টারনেট না থাকায় তা সঙ্গে সঙ্গে অফিসে পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। উপরন্তু, নিজের কোনো ক্ষতি হলে বা পুলিশের হয়রানির শিকার হলে সেই খবরটি যে কাউকে জানাবেন, সেই উপায়টুকুও ছিল না।
কামরুজ্জামান বাবলু জানান, কঠোর সান্ধ্যআইন বা কারফিউর মধ্যেও অনেক সাধারণ তরুণ ও আন্দোলনকারী ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে সাংবাদিকদের সাহায্য করতেন। তারা গোপনে পেনড্রাইভ বা ব্লুটুথের মাধ্যমে সংগৃহীত ফুটেজ সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতেন। সংগৃহীত এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ভিডিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পাঠানোর জন্য কারওয়ান বাজারে অবস্থিত এএফপি অফিসে গিয়ে ফুটেজ পাঠাতে হতো। যেখানে সীমিত আকারে ইন্টারনেট সচল ছিল। তবে সেই অফিসের ঠিক এক তলা নিচেই র্যাবের মিডিয়া উইং থাকায় প্রতিমুহূর্তে গ্রেফতার বা নজরদারির চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হতো।
তিনি আরো বলেন, সে সময় বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। একদিকে তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর পাঠানোকে ‘অপপ্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে অত্যন্ত অসহনশীল আচরণ করছিলেন। অন্যদিকে, আন্দোলনের শুরুর দিকে অনেক গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক ভূমিকার কারণে সাধারণ আন্দোলনকারীরাও সংবাদকর্মীদের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। ফলে মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের একদিকে পুলিশের হয়রানি এবং অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ- এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে জীবন বাজি রেখে কাজ করতে হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তারা একা চলাফেরা না করে সবসময় চার-পাঁচজন একসাথে হেলমেট ও জ্যাকেট পরে চলাফেরা করতেন।
যেভাবে ৯ দফা পৌছে দেয়া হলো গণমাধ্যমের হাতে
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর সোয়া ৩টার কাছাকাছি। ‘দৈনিক কালবেলা’র তৎকালীন সংবাদকর্মী ইসরাফিল ফরাজী তারই আরেক সহকর্মী অন্তু মুজাহিদকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার কাঁটাবনে একটি বহুতল ভবনে প্রবেশ করেন। ভবনটির ১২০৪ নম্বর রুমে অবস্থিত একটি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে পা রাখতেই তাদের চোখে পড়ল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। বেশ কয়েকজন ছাত্র প্রতিনিধি এক রুম থেকে অন্য রুমে ছোটাছুটি করছেন। কেউ ফোনে ব্যস্ত, কেউবা তীব্র উত্তেজনার মাঝেও কাজের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। পাশের রুমে চার-পাঁচজন মিলে ল্যাপটপে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা লিখছেন। অন্তু মুজাহিদের বর্ননা অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর বর্তমান ভিপি সাদিক কায়েম, শিবির নেতা সিবগাতুল্লাহ সিবগা, মুতাসিম বিল্লাহ শাহেদী, এস এম ফরহাদ এবং মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদসহ আরও কয়েকজন। কেউ ফোনে আন্দোলনের মাঠে পানি পৌঁছানোর তদারকি করছেন। কেউ আবার গুলিবিদ্ধদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করছেন। চারদিকে যেন এক অঘোষিত কন্ট্রোলরুমের ব্যস্ততা।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ল্যাপটপে প্রস্তুত হলো ঐতিহাসিক ৯ দফার খসড়া। ইসরাফিল ফরাজী ভাষাগত ভুলগুলো ঠিক করার পর অন্তু মুজাহিদকে বললেন বানানগুলো আরেকবার দেখে দিতে। অন্তু মুজাহিদ দি ইনসাইটাকে বলেন, আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বানানগুলো ঠিক করলাম। এরপর আলোচনা শুরু হলো এই ৯ দফা কার নামে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো— যেহেতু আব্দুল কাদের তখন নিরাপদ স্থানে আছে, তাই তার নামেই এটি প্রকাশ করা হবে।
৯ দফা প্রস্তুত। কিন্তু বাইরে তখন রণক্ষেত্র। কাঁটাবন ও বাটা সিগন্যাল এলাকা থমথমে। বাইরে অনবরত গুলির শব্দ। এর মধ্যেই রুমে বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো দেশ ইনটারনেট ব্লাকআউটে। প্রিন্ট করার কোনো উপায়ও ছিল না। সিদ্ধান্ত হলো- বাটন ফোন থেকে মেসেজ করে এবং বাংলা মোটর গিয়ে প্রিন্ট করিয়ে এটি বিভিন্ন মিডিয়া হাউজে পৌঁছে দেয়া হবে। অন্তু মুজাহিদ বলেন, তখন নিচে নেমে দেখি ভবনের মেইন কলাপসিবল গেটে ডাবল তালা দেয়া। দারোয়ান ভয়ে গেট খুলতে নারাজ। বাইরে পুলিশ তখন পুরোপুরি অ্যাকশন মুডে। দারোয়ানকে কিছুটা ধমক দিতেই সে বলল, “মামা সাবধানে যাইয়েন, পুলিশ কিন্তু গুলি করতাছে।” হাতে কালবেলার আইডি কার্ড উঁচিয়ে আমি সবার আগে বের হলাম। আমার পেছনে ইসরাফিল ফরাজী, সিবগাতুল্লাহ, মোসাদ্দেকসহ কয়েকজন। সবাইকে বললাম সোজা আমাকে অনুসরণ করতে। রাস্তায় প্রথম দুই সারির পুলিশ শুয়ে রাইফেল তাক করে আছে। তাদের পেছনের লাইনটি হাঁটু গেড়ে বসা এবং বাকিরা পেছনে দাঁড়িয়ে। আমরা ঠিক তাদের বাম পাশ দিয়ে এগোচ্ছিলাম। একজন পুলিশ অফিসার তেড়ে আসতেই দূর থেকে আইডি কার্ড দেখিয়ে চিৎকার করে বললাম— সাংবাদিক, আমরা সাংবাদিক! তখন পুলিশ আমাদের ইশারা দিয়ে দ্রুত চলে যেতে বলল। আমরা ডান পাশের গলি দিয়ে বাজারের ভেতর হয়ে নিরাপদে বেরিয়ে এলাম।
বাজার পার হয়ে অন্তু মুজাহিদ, মোসাদ্দেক ও সিবগাতুল্লাহসহ তিনজনকে রিকশা ঠিক করে বিদায় দিয়ে আবার বাংলা মোটরে ইসরাফিল ফরাজির আরেকটি অফিসে মিলিত হলেন। সেখান থেকে প্রিন্ট করা ৯ দফার হার্ড কপি নিয়ে দুটি মোটরসাইকেলে চারজন ভাগ হয়ে পুরো ঢাকার মিডিয়া পাড়ায় ছড়িয়ে পড়লেন। একটি বাইক রওনা হলো সময় টিভি, বিজয় টিভি, বাংলাভিশন, ইটিভি, আরটিভি, এনটিভি, এটিএন বাংলা, এটিএন নিউজ, মানবজমিন, ইত্তেফাক, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের উদ্দেশ্যে। অন্য বাইকটি গেল চ্যানেল ২৪, দীপ্ত টিভি, চ্যানেল আই, ডিবিসি, বৈশাখী টেলিভিশন, যমুনা টিভি, যুগান্তর এবং বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া হাউজগুলোতে।
অন্তু মুজাহিদের বর্ননা অনুযায়ী, পরদিন ২০ জুলাই দুপুরের দিকে অফিস থেকে বের হয়ে বৃষ্টির মধ্যেই বাংলা মোটর এলেন তিনি। ৯ দফার কপি নিয়ে তার ডিসকভার ১০০ সিসি মোটর সাইকেলে করে ইসরাফিল ফরাজীকে নিয়ে রওনা হলেন ‘এখন টিভি’র কার্যালয়ের দিকে। পথে পথে তখন বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, চারদিকে চরম উত্তেজনা। মতিঝিল এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পাহারায় সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। সাংবাদিক পরিচয় দিয়েও সহজে পার হওয়া যাচ্ছিল না। দায়িত্বরত কমান্ডারের সাথে কথা বলে অনেক অনুরোধের পর মতিঝিল উটের খামারের পাশ দিয়ে সামনে এগোলেন তারা। এরপরের চেকপোস্টেও সেনাবাহিনী আটকে দিলে তাদের আবার বুঝিয়ে অবশেষে এখন টিভির সামনে পৌঁছালেন অন্তু মুজাহিদ ও ঈসরাফিল ফরাজী।
অন্তু মুজাহিদ বলেন, এখন টিভির এসাইনমেন্ট ইনচার্জ মাহমুদ রাকিবের হাতে ৯ দফা তুলে দিয়ে তাকে অনুরোধ করলাম তার পরিচিত অন্যান্য সাংবাদিকদের কাছেও যেন পৌঁছে দেয়া হয়। এভাবেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেয়া সেই ৯ দফা চোখের সামনে লেখা হলো। নিজ হাতে তার বানান সংশোধন করলাম। ইন্টারনেট বিহীন বাংলাদেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিলাম ৯ দফা দেশের প্রতিটি গণমাধ্যমে।
যেভাবে বিশ্ব মিডিয়ায় ইমাম হোসেন তাঈম হত্যাকাণ্ড প্রচার
“স্যার, আমার ছেলেটা মারা গেছে। বুলেটে ওর বুক ঝাজরা হয়ে গেছে। স্যার, আমার ছেলে আর নেই। একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার?”— কথাগুলো বলছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। তার ছেলে ইমাম হাসান তাইম ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলায় পুলিশেরই গুলিতে নিহত হন। ছেলের ঝাঁজরা বুক দেখে এভাবেই সিনিয়র অফিসারকে ফোন করে নিজের বুকফাঁটা আক্ষেপের কথা বলতে থাকেন ময়নাল হোসেন।
ইমাম হাসান তাইম হত্যাকাণ্ডের ভিডিওটি গোটা দেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। কিন্তু কীভাবে ইন্টারনেট ব্লাকআউটের সময় এটি সারা পৃথিবীর দর্শকদের কাছে পৌঁছে? দি ইনসাইটাকে একান্ত সাক্ষাৎকারে সেই গল্প তুলে ধরেছেন এখন টিভির ডেপুটি এসাইনমেন্ট ইনচার্জ ও সিনিয়র রিপোর্টার বেলায়েত হোসাইন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে পুলিশ কর্তৃক নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় নিরীহ শিক্ষার্থীজ ইমাম হাসান তাইমকে। দৃশ্যটি ধরা পড়ে নিউজ ২৪ এর তৎকালীন প্রতিবেদক আরেফিন শাকিল এর ক্যামেরায়। পুলিশের নিষ্ঠুরতা দেখে তিনি দ্রুত তার ক্যামেরাম্যানকে রেকর্ডের নির্দেশ দেন। তবে অফিসে ফেরার পর শুরু হয় অন্য যুদ্ধ। কিছু আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকদের হুমকি ও চাপের মুখে প্রধান প্যানেল থেকে সেই ফুটেজ মুছে দিতে বাধ্য করা হয়। প্যানেলের কম্পিউটারের স্কিন থেকে নিউজ ২৪ এর সংবাদকর্মী উম্মে মারুফা এবং হাবিবুল ইসলাম হাবিব ভিডিওটি গোপনে নিজের মোবাইলে রেকর্ড করে নেন।
বেলায়েত হোসাইন বলেন, পরদিন ২১ জুলাই সারা দেশের চোখ তখন কোটা সংস্কার সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের দিকে। হাইকোর্টের বারান্দায় ডিউটিরত হাবিবুল ইসলাম হাবিবের সাথে আমার দেখা হয়। হাবিব আমাকে লুকিয়ে রাখা সেই বুক কাঁপানো ভিডিওটি দেখান। ইন্টারনেট ব্ল্যাকাউটের কারণে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্লুটুথের মাধ্যমে ভিডিওটি আমি আমার ফোনে নিয়ে নিই। সেদিন কোটার রায় এবং সরকারের পক্ষে বিভিন্ন মহলের বক্তব্য নিয়ে যখন চারপাশ মুখরিত, আমার মন তখন পড়ে ছিল তাইম হত্যাকাণ্ডের নির্মমতায়। যেকোনো মূল্যে এই ভিডিওটি প্রকাশের উপায় খুঁজতে থাকি। বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যম যে ভিডিওটি প্রচার করবে না, সেটা আমার বুজতে বাকি রইলো না। তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভিডিওটি পাঠানোর পথ খুঁজতে থাকি।
বেলায়েত বলেন, আদালত চত্বরেই আমার সাথে দেখা হয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিনিধি তানভীর ভাই এবং টিআরটি ওয়ার্ল্ডের কামরুজ্জামান বাবলু ভাইয়ের সাথে। যেহেতু ইন্টারনেট নেই, তাই ব্লুটুথেই বাবলু ভাইকে প্রায় আধাঘন্টা সময় ধরে ভিডিওটি ট্রান্সফার করি। বাবলু ভাইয়ের মাধ্যমে তানভীর ভাইয়ের সাথে পরিচিত হয়ে অত্যন্ত গোপনে তাকেও ভিডিওটি ব্লুটুথের মাধ্যমে ট্রান্সফার করি। এরপরই আল-জাজিরা এবং টিআরটি ওয়ার্ল্ডের পর্দায় বিশ্ববাসী দেখতে পায় বাংলাদেশের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ড। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অবশেষে ইমাম হাসান তাইমের হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
সেন্সরশিপ ও সংবাদের কাটছাঁট
মেইনস্ট্রিম বা সাধারণ টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর লাইভ সম্প্রচার ডিভাইস এবং আধুনিক টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতিগুলো মূলত মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। আন্দোলন চলাকালীন হঠাৎ মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক লাইভ সম্প্রচার পুরোপুরি বন্ধ। এই প্রযুক্তিগত অচলাবস্থার কারণে মাঠের সংবাদ সরাসরি স্টুডিওতে পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক কাজের গতিতে বড় ধরনের ছেদ ঘটে।
সরাসরি লাইভ দিতে না পেরে সাংবাদিকরা তখন বিকল্প পদ্ধতি বেছে নেন। তারা ঘটনাস্থলে থেকে লাইভের মতো করে ভিডিও বা ‘অ্যাজ লাইভ’ রেকর্ড করতেন। এরপর সেই স্টোরেজ কার্ডগুলো দ্রুত অফিসে পাঠানোর জন্য অফিসের গাড়ি এবং চালকদের ব্যবহার করতেন। অনেক সময় দূরবর্তী বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হতো তাদের। নিজেদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে গাড়ি ও চালককে দিয়ে কার্ডগুলো অফিসে পাঠিয়ে সাংবাদিকরা দিনভর সড়কেই অবস্থান করতেন।
এভাবেই সেসময়কার টিভি সাংবাদিকতার বর্ননা দিয়েছেন এখন টিভির সিনিয়র রিপোর্টার আজাহার লিমন। দি ইনসাইটাকে তিনি জানান, মাঠ থেকে অনেক কষ্ট করে পাঠানো সংবাদগুলো স্টুডিওতে পৌঁছানোর পর তৎকালীন সরকারের চাপ, ভয় অথবা নিউজ রুমের অভ্যন্তরীণ ‘গেইটকিপিং’-এর কারণে তীব্র সেন্সরশিপের মুখে পড়ত। মাঠের নিরেট বাস্তবতার বর্ণনা, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কিংবা পুলিশের গুলির চিত্র সম্বলিত ২-৩ মিনিটের একটি বিস্তারিত ‘অ্যাজ লাইভ’ প্রতিবেদন শেষ পর্যন্ত কাটছাঁট করে মাত্র ৩০ সেকেন্ডে নামিয়ে আনা হতো। ইন্টারনেট না থাকায় মাঠের সাংবাদিকদের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে জানারও উপায় ছিল না যে তাদের পাঠানো সংবাদটি কতটুকু প্রচার হলো।
হাসিনার পালানোর খবরও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না
জুলাইয়ের ১৮ তারিখ উত্তরায় ভয়াবহ গোলাগুলির ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন ডয়েচে ভেলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি নাহিদ আনজুম। সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে দেখতে পান তার বাসার ইন্টারনেট সংযোগ নেই। অফিসে ভিডিও ফুটেজ ও নিহতদের খবর পাঠানোর জন্য তিনি বিশাল অসুবিধার মধ্যে পড়েন। সে সময়কার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি দি ইনসাইটাকে জানান, এলাকার ইন্টারনেট প্রোভাইডারের সাথে যোগাযোগ করলে ৫ হাজার টাকা বিনিময়ে একটি বিশেষ লাইনের ব্যবস্থা করে দেন। যার সাহায্যে ল্যাপটপ থেকে ভিডিওগুলো অফিসে আপলোড করতে সক্ষম হই।
তিনি বলেন, ৫ই আগস্ট সকালের দিকে একজন আর্মি স্টাফের কাছ থেকে খবর পাই শেখ হাসিনা হয়তো দেশ ছেড়ে পালাবেন। কিন্তু ওই সময়ে দেশজুড়ে সম্পূর্ণ ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ছিল। কোনো ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় এই খবরের সত্য-মিথ্যা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই ডযেচে ভেলের হারুনুর রশীদ স্বপন ভাই এবং এএফপি-র শফিক ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে খবরটির সত্যতা নিশ্চিত করি।
যেভাবে ফিরে আসে ইন্টারনেট
অভূতপূর্ব এক ডিজিটাল লকডাউন। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক দাবি করেছিলেন, মহাখালীর খাজা টাওয়ারের ডেটা সেন্টারে দুর্বৃত্তদের অগ্নিসংযোগের কারণে এই বিপর্যয়। যদিও পরবর্তী সময়ে ক্লাউডফ্লেয়ার, ওওনি’র মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তদন্তে জানা যায়, কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপে এবং সরাসরি লিখিত ইমেইল নির্দেশনায় ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে এবং মোবাইল অপারেটরদের বাধ্য করা হয়েছিল সংযোগ কেটে দিতে। এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
এই শাটডাউনের পেছনে কাজ করেছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বহুমাত্রিক কিছু প্রযুক্তিগত কৌশল। পুরো দেশের ডেটা ট্রাফিক এক ধাক্কায় শূন্যে নামিয়ে আনার পাশাপাশি চালানো হয়েছিল ‘ব্যান্ডউইথ থ্রটলিং’। অর্থাৎ ইন্টারনেটের গতি ৪জি থেকে কমিয়ে ২জি’তে নামিয়ে দেয়া, যাতে মানুষ টেক্সট পাঠাতে পারলেও কোনো ছবি বা ভিডিও আপলোড করতে না পারে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের ক্যাশ সার্ভার। এমনকি মানুষ যাতে বিকল্প উপায়েও দুনিয়ার সাথে যুক্ত হতে না পারে, সেজন্য ভিপিএন প্রোটোকলগুলোও ব্লক করার আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হয়েছিল।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের বিষয়টিকে একদিকে মৌলিক মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন বলছেন অনেকে। অন্যদিকে মাত্র কয়েক দিনের এই অন্ধকারে দেশের অর্থনীতি, ফ্রিল্যান্সিং খাত এবং ই-কমার্সকে কার্যত পঙ্গু করে দেয়া হয়। শত শত কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়।
অবশেষে ৫ আগস্ট দুপুরে হাসিনা সরকারের পতনের পরই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেয় দেশের ইন্টারনেট। ২০২৫ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে গণহত্যা ও তথ্য গোপনের অভিযোগে সজীব ওয়াজেদ জয়সহ তৎকালীন কয়েকজন নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রণয়ন করে “সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫”। নতুন এই আইনে নাগরিকদের ২৪ ঘণ্টা ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।





