যেভাবে বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করেছিলেন শফিকুল আলম
জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ যখন অন্ধকারে, ইন্টারনেট পুরোপুরি ব্লাকআউট, তখন এএফপি অফিসের কম্পিউটারগুলোই হয়ে উঠল বিশ্বের সঙ্গে দেশের একমাত্র জানালা। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ভেতর থেকে সেই সত্য কীভাবে বাইর
During the July 2024 uprising, Bangladesh turned into a digital prison. Repeated nationwide internet blackouts cut the country off from the outside world. At that critical moment, the then AFP Bangladesh bureau chief Shafiqul Alam opened his office's internet to local and foreign media — and through it, the world began to learn what was unfolding in Bangladesh. On August 5, 2024, Alam was the first to break the news of Sheikh Hasina's escape, a report that reverberated around the world. He later served as press secretary to the interim government's chief adviser, Dr. Muhammad Yunus, and is now editor of the English daily Daily Waadaa. In an exclusive interview with The Insighta, he recounts how, from inside that digital prison, he reconnected Bangladesh to the open sky during the days of the internet shutdown. His account is reproduced here verbatim.
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশ পরিণত হয় এক ডিজিটাল কারাগারে। দফায় দফায় সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেশটিকে কার্যত ‘কমিউনিকেশন ব্ল্যাকআউট’-এ ঠেলে দেওয়া হয়। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগও। এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে এগিয়ে আসেন তৎকালীন এএফপির বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ শফিকুল আলম। তিনি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর জন্য তাঁর অফিসের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ফলে গোটা বিশ্ব বাংলাদেশের পরিস্থিতি আবার জানতে শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার সংবাদও সবার আগে ব্রেক করেন শফিকুল আলম। মূলত সেই সংবাদ দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন তৈরি করে। এরপর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ইংরেজি দৈনিক ডেইলী ওয়াদার সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন। ইন্টারনেট শাটডাউনের দিনগুলোতে ডিজিটাল কারাগারে থেকে কীভাবে বাংলাদেশকে মুক্ত আকাশের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিলেন — পুরো গল্পটা তিনি ইনসাইটার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন। তার বলা কথাগুলো তুলে ধরা হলো হুবহু।
১৭ জুলাইয়ের সেই থমথমে রাত। চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা। যার পরপরই পুরো দেশের ইন্টারনেট শাটডাউন করে দেয়া হলো। আমরা তখন অফিসে। হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমাদেরও ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। চারপাশের পরিস্থিতি তখন দ্রুত পাল্টাচ্ছে, হলগুলো খালি করে দেয়া হচ্ছে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে আমাদের কাভারেজ সচল রাখতে অফিস থেকে তড়িঘড়ি করে সোনারগাঁও হোটেলে রুম ভাড়া করা হলো। যাতে অন্তত কম্পিউটার এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা যায়।
১৮ তারিখ সকালে অফিসে এসে আমরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম। পুরো দেশে কারও ইন্টারনেট নেই। কিন্তু আমাদের অফিসে ইন্টারনেট সচল। আসলে আমরা ভিস্যাটের মাধ্যমে হংকং থেকে একটা বিকল্প লাইন টেনে রেখেছিলাম। যার কারণে পুরো ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও আমরা সংযোগ ধরে রাখতে পেরেছিলাম।
আমাদের কাছে ইন্টারনেট আছে জানতে পেরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো খোঁজা শুরু করল। প্রথমে রয়টার্সের এশিয়া চিফ আমাদের চিফের সাথে যোগাযোগ করলেন। এরপর এশিয়া চিফ আমাকে সরাসরি ফোন দিয়ে বললেন, “তুমি কি ওদের সাহায্য করতে পারবা? এটা সম্পূর্ণ তোমাদের সিদ্ধান্ত। তুমি কমফোর্টেবল ফিল করলে দাও, না চাইলে জোর নেই। কারণ কোনো বিপদ বা আইনি ঝামেলা হলে তো সেটা তোমার ওপরই আসবে।”
ঝুঁকিটা পুরো আমার ঘাড়ে জেনেও আমি ভাবলাম- এই সংকটে আমরা একা একা সংযোগ সচল রেখে স্বার্থপরের মতো বসে থাকব, এটা কেমন দেখায়। আমি রয়টার্সকে আমাদের অফিস থেকে কাজ করার অনুমতি দিলাম।
এরপর যেন বাঁধ ভাঙল। রয়টার্সের পর একে একে ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, নেত্র নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, স্প্যানিশ নিউজ এজেন্সি ইএফই- সবাই এসে আমাদের অফিসে হাজির। শুধু বিদেশী মিডিয়া নয়, দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকা যেমন- ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, সমকালের মতো প্রমিনেন্ট দৈনিকগুলোর প্রতিনিধিরাও চলে এলেন। কারণ বাইরে তখন ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটছে, অথচ তারা কোনো নিউজ বা ছবি পাঠাতে পারছিলেন না। ক্যালিফোর্নিয়া প্রবাসী এক ডক্টর ভাই তো রাতে এসে অনুরোধ করলেন তাঁর অনলাইন পরীক্ষার জন্য লাইন দিতে। আমরা তাঁর জন্যও অফিস খোলা রাখলাম।
আমাদের অফিসে মাত্র পাঁচটা কম্পিউটার। আর সেখানে কাজ করতে এসেছেন প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক। আমার কাজ হলো সবার রেশনিং করা। ওই পরের ছয়-সাত দিন বাংলাদেশ থেকে যত বিদেশী নিউজ গেছে সব আমার এখান থেকে হইছে। সবার সময় ভাগ করে দিতাম- ১০ থেকে ১৫ মিনিট এর মধ্যে যে যার জরুরি কাজ বা ছবি-ভিডিও পাঠিয়ে আরেকজনকে সুযোগ করে দেবে। ভিডিও ফাইল পাঠাতে অনেক সময় লাগত, তাও আমরা আমাদের এই ছোট্ট অফিস কক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।
বাইরে তখন এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, কিন্তু আমাদের ভেতরের পরিবেশটা হয়ে উঠেছিল এক অন্যরকম উৎসবমুখর, যেন একচিলতে মুক্ত দুনিয়া। সবার জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতাম, নাশতা পানি খাওয়াতাম। একটা অন্যরকম হাটবাজার বসে যেত প্রতিদিন। অথচ এর পেছনে এক তীব্র মানসিক চাপ তাড়া করে ফিরত আমাদের। চারদিক থেকে হুমকি আসছিল, সরকারের প্রেস ব্রিফিংয়েও আমাদের ইঙ্গিত করে পরোক্ষভাবে বলা হচ্ছিল যে এটা ‘ইলিগাল’। ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও আমরা কীভাবে লাইন চালাচ্ছি! শোনা গেল যে আমার নামে কমপ্লেইন হয়েছে। আওয়ামীপন্থী সাংবাদিকরা আমাকে ফোন করে থ্রেটও দেয়ার মতো—’হ্যাঁ ভাই দেইখেন, আপনারে কিন্তু পুরো ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি… ইয়ে… ইত্যাদি। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আরাফাত এবং হাসান মাহমুদ তাদের প্রেস ব্রিফিংয়েও হালকা আমাদের ব্যাপারে ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু আমরা তো আমাদের নৈতিক জায়গা থেকে লড়ে যাচ্ছিলাম। আমার চোখের সামনে তখন ফটোগ্রাফারদের পাঠানো ভয়াবহ সব হত্যাকাণ্ডের ছবি ভেসে উঠছে। আমি জানতাম, এই সত্যগুলো যেকোনো মূল্যে বাইরে যাওয়া দরকার। আমি একা দিলে হয়তো একটা নির্দিষ্ট ডেস্কে যেত, কিন্তু সবাইকে সুযোগ করে দেয়ায় সত্যটা একযোগে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল।
এই পুরো যুদ্ধটায় আমি একা ছিলাম না। আমার ফটোগ্রাফার সহকর্মী মনিরুজ্জামান, ভিডিওর মাজেদ, আর ফ্যাক্ট চেকিংয়ের কদরুদ্দীন শিশির ও ইয়ামিন- সবাই জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছে। আমরা সকাল ৬টায় এসে অফিস খুলতাম। আর কাজ শেষ করে বের হতে হতে কোনো কোনো দিন রাত ১২টা বা ২টা বেজে যেত।
সবাই বলাবলি শুরু করলো যে- আমার অফিস সরকার বিরোধী নিউজের একটা ডেন হয়ে গেছে, আখড়া হয়ে গেছে। কিন্তু ভাই, আপনে খুন করবেন, আর আমরা এটা বিদেশে নিউজ দিতে পারবো না? হ্যাঁ, আমার চোখের সামনে খুন হচ্ছে, দেখতেছি। আমাদের ফটোগ্রাফাররা ছবি পাঠাচ্ছে- ভয়াবহ খুন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে যারা অন্য সময়ে আমার পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, এই সংকটে আমরা সবাই এক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ দিনশেষে আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল- নিউজ বাইরে পাঠানো উচিত। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, জীবনের সমস্ত ঝুঁকির মাঝেও ওই ছয়-সাতটা দিন ছিল আমার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং গর্বের একটি অধ্যায়।
শফিকুল আলম
সম্পাদক, ডেইলী ওয়াদা
অন্তবর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব
ও এএফপির সাবেক ব্যুরো চিফ





