শক্তিশালী' করার নামে 'নখদন্তহীন' হচ্ছে মানবাধিকার কমিশন
যে খসড়ায় কমিশন শক্তিশালী হওয়ার কথা, সেখানেই সংকুচিত হচ্ছে তার স্বাধীনতা। বাছাই কমিটিতে বিচারকের বদলে মন্ত্রীরা, অভিযুক্ত বাহিনীই দেবে নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন। ফলে ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও।
A draft law meant to strengthen the National Human Rights Commission of Bangladesh would instead hollow it out. Ministers — including the home minister — would join the panel that selects commissioners, in place of a judge; the president gains the final pick. Security forces accused of abuses would investigate themselves. Commissioners’ salaries lose their constitutional shield. Rights advocates warn the result is a watchdog stripped of teeth, and of any realistic path to top-tier international accreditation.
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। নাগরিকের যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের রক্ষকবচ। কাগজে-কলমে এটি একটি ‘স্বাধীন সংস্থা’। কিন্তু বাস্তবে এই কমিশনকে বানোনো হচ্ছে এমন একটি খাঁচা, যার দরজা খোলার চাবিটি থাকবে খোদ সরকারেরই পকেটে। কথা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-কে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী আইন হিসেবে রূপ দেয়া হবে। কিন্তু করা হচ্ছে আরো দুর্বল আইন। এই প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া পর্যালোচনা করেও দি ইনসাইটা একই চিত্র তুলে ধরেছিল: অভিযুক্তরাই করবেন গুমের তদন্ত, দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে নির্দেশদাতাকে।
মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কমিশনার বাছাই কমিটিতে বিচারকের জায়গায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি, কমিশনের আর্থিক ও প্রবিধান প্রণয়নের স্বাধীনতা খর্ব এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত আইন শৃঙ্খলা-বাহিনীর ওপরই তদন্তের এখতিয়ার ন্যস্ত করে প্রতিষ্ঠানটির মেরুদণ্ডই ভেঙে দেয়া হচ্ছে।
খসড়া আইনে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইনে কমিশনের স্বাধীনতা কাঠামোগতভাবে অনেক বেশি সংকুচিত। কমিশনার নিয়োগের বাছাই কমিটি থেকে শুরু করে কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা, প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘প্যারিস প্রিন্সিপলস’-এর নিরিখেও খসড়াটি পিছিয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এই খসড়া বর্তমান রূপে পাস হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রাষ্ট্রের কোনো অন্যায় বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারাবে এবং পরিণত হবে কেবলই সরকার-নিয়ন্ত্রিত একটি ‘অভিযোগ-গ্রহণ কেন্দ্রে’। আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ‘এ-স্ট্যাটাস’ স্বীকৃতি অর্জন হয়ে উঠবে আরও দূরের স্বপ্ন।
জাতীয় মানবাধিকার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস দি ইনসাইটাকে বলেন, কমিশনের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে তাদের স্বাধীনতা খর্ব করার যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা কোনো ব্যক্তিগত মতামত নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সমস্যা। বিশ্বজুড়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনগুলো গঠনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড বা ‘প্যারিস প্রিন্সিপলস’ অনুসরণ করা হয়। বর্তমান সরকারের করা খসড়া আইনটির ধারাগুলো সরাসরি সেই নীতিমালার পরিপন্থী। কারণ ‘প্যারিস প্রিন্সিপলস’-এ স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, বাছাই কমিটি এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে—যা একটি মানবাধিকার কমিশনের জন্য অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। অথচ এখানে সেই অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলোকেই লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
বাছাই কমিটিতে বিচারকের বদলে মন্ত্রীরা
প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের খসড়া আইনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ সার্চ কমিটির কাঠামোয়। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এই কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক—এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা বা দলীয় সংশ্লিষ্টতা নেই। কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন মানবাধিকার সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি। অর্থাৎ কমিটিতে ছিল সরকারের বাইরের স্বাধীন মতের লোকেরা।
নতুন খসড়ার ধারা ৭ অনুযায়ী, বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন জাতীয় সংসদের স্পীকার, যিনি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভোটে নির্বাচিত একজন দলীয় পদাধিকারী। কমিটিতে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীকে। এর সঙ্গে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং দুজন সংসদ সদস্য। বিপরীতে অধ্যাদেশে থাকা সাংবাদিক ও নৃগোষ্ঠী প্রতিনিধি—এই দুইজনকে কোনো বিকল্প ছাড়া কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ফলে সাত সদস্যের কমিটির অন্তত তিনজনই এখন সরকারের শীর্ষ রাজনৈতিক পদাধিকারী। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ, র্যাব ও আনসারসহ বেশিরভাগ শৃঙ্খলা-বাহিনীর নিয়ন্ত্রক মন্ত্রণালয়। যে বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কমিশনে আসবে, সেই বাহিনীর নিয়ন্ত্রক খোদ মন্ত্রীই কমিশনার বাছাইয়ের কমিটিতে বসছেন। এটি স্বার্থের সরাসরি সংঘাত তৈরি করে। যে কমিশনার নিয়োগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মতি লেগেছে, তাঁর পক্ষে পরবর্তী সময়ে সেই মন্ত্রণালয়ের অধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া বাস্তবে কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাষ্ট্রপতির হাতে চলে গেল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আরেকটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে মাত্র একজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করত এবং রাষ্ট্রপতি সেই সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগ দিতে বাধ্য থাকতেন। অর্থাৎ প্রকৃত সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ছিল স্বাধীন বাছাই কমিটির হাতেই।
কিন্তু নতুন খসড়ার ধারা ৮(ঘ) অনুযায়ী, কমিটিকে প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে হবে। এতে রাষ্ট্রপতি দুজনের মধ্য থেকে পছন্দ করার প্রকৃত সুযোগ পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা কার্যত বাছাই কমিটি নয়, বরং নির্বাহী বিভাগ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাছাই কমিটি এখন কেবল একটি তালিকা সরবরাহকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে।
অভিযুক্ত বাহিনীই দেবে নিজের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন
কমিশনের কার্যকারিতার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুতর দুর্বলতাটি রয়েছে খসড়ার ধারা ২০-এ। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন নিজে তদন্ত করবে না। কমিশন সংশ্লিষ্ট বাহিনী প্রধান বা সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন চাইবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন সন্তুষ্ট হলে বিষয়টির আর কোনো অগ্রগতি হবে না। সন্তুষ্ট না হলে কমিশন কেবল সুপারিশ করতে পারবে। আর সংশ্লিষ্ট বাহিনী প্রধান বা সরকার ছয় মাসের মধ্যে জানাবে তারা কী করেছে। অর্থাৎ র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রতিবেদন দেবে র্যাব নিজেই; পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রতিবেদন দেবে পুলিশের কমান্ড কাঠামো। কোনো পর্যায়েই কোনো স্বাধীন তথ্য-অনুসন্ধান হবে না। সাধারণ অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের তদন্ত কর্মকর্তার ফৌজদারি কার্যবিধি-সদৃশ ক্ষমতা থাকে—সাক্ষীকে তলব করা, নথি চাওয়া, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা। কিন্তু ধারা ২০-এর অধীনে বাহিনীর ক্ষেত্রে এসব ক্ষমতার কোনোটিই প্রয়োগযোগ্য নয়। কমিশন কাউকে তথ্য দিতে বাধ্য করতে পারবে না, কোনো স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারবে না, কোনো নথি জব্দ করতে পারবে না।
বিষয়টিকে আরও গুরুতর করেছে স্বার্থ-সংঘাত নিষেধাজ্ঞার অপসারণ। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্পষ্ট বলা ছিল, একই বাহিনীর কোনো সদস্য সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত করতে পারবেন না। নতুন খসড়া থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ তুলে দেয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে অধ্যাদেশে থাকা আরেকটি সুরক্ষাও বাদ পড়েছে। সেখানে বলা ছিল, তদন্তাধীন কোনো বাহিনী-সদস্যকে গ্রেপ্তারে সরকার বা নিয়োগকর্তার অনুমোদন লাগবে না। এই বিধান তুলে দেয়ায় বাহিনীর নিজস্ব কমান্ড কাঠামো গ্রেপ্তারের ওপর কার্যত ভেটো দাবি করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। খসড়ার ধারা ২৮(৩)-এ কমিশনের আদেশ অমান্য করলে প্রাতিষ্ঠানিক দায়ের বিধান রয়েছে। সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ের কথা বলা হলেও শৃঙ্খলা-বাহিনীর নাম নেই। ফলে কোনো বাহিনী প্রধান কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষা করলে আইনে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দায় আরোপের সুস্পষ্ট কোনো সুযোগ থাকছে না। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে গুম, হেফাজতে মৃত্যু ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর লঙ্ঘনের প্রধান অভিযোগ উঠেছে এই বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধেই। ঠিক সেই বাহিনীগুলোকেই কমিশনের স্বাধীন তদন্তের নাগালের বাইরে রাখা মানে, যাদের জবাবদিহি করাতে কমিশন, তাদের ওপর থেকেই কমিশনের এখতিয়ার তুলে নেয়া।
এই বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস দি ইনসাইটাকে বলেন, প্রস্তাবিত বা বিদ্যমান আইনের বর্তমান রূপ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার কোনো সঠিক তদন্ত বা প্রতিকার সম্ভব নয়। কারণ এখানে স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। যে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্তের দায়িত্বও তাদের হাতেই ন্যস্ত করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের আমলেই দেখা গেছে যে, কোনো বাহিনী সাধারণত নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করে না; করলেও তা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী বা বিরল ঘটনা। আইনের ভেতরেই এই স্বার্থের সংঘাতকে ঢুকিয়ে দেয়ার কারণে কাঠামোগতভাবেই এর কোনো সুরাহা হওয়া সম্ভব নয়।
‘কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়’ — এই সুরক্ষাটিই উধাও
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে একটি স্পষ্ট আইনি দেয়াল ছিল, কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীন হবে না। এটি ছিল নির্বাহী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কমিশনের সরাসরি আইনি রক্ষাকবচ। নতুন খসড়ায় এই বিধানটি তুলে দিয়ে কেবল বলা হয়েছে, কমিশন ‘একটি স্বাধীন সংস্থা’ হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার সাধারণ ঘোষণা আর নির্দিষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা এক জিনিস নয়। GANHRI স্বীকৃতি পর্যালোচনায় ঠিক এই ধরনের সুস্পষ্ট আইনি ফায়ারওয়াল খোঁজা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতার হস্তান্তর। আগে কমিশন নিজেই নিজের অভ্যন্তরীণ কর্মপদ্ধতি সংক্রান্ত প্রবিধান করতে পারত, কেবল রাষ্ট্রপতির অনুমোদন লাগত। নতুন খসড়ায় বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সরকারকে, গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। অর্থাৎ কমিশন এখন সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া নিজের অভিযোগ-গ্রহণ পদ্ধতি, তদন্তের মানদণ্ড বা কর্মীদের চাকরির শর্ত পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারবে না। এই দুই পরিবর্তন মিলিয়ে কমিশন কার্যত আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রভাববলয়ে চলে গেছে।
বেতন আটকে দিয়েই চাপ দেয়া যাবে কমিশনারদের
আর্থিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পশ্চাদপসরণ ঘটেছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনারদের বেতন-ভাতা সংবিধানের ৮৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত করা হয়েছিল। এর অর্থ, কমিশনারদের বেতন সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত ছিল এবং নির্বাহী বিভাগ ইচ্ছে করলেই তা আটকাতে বা কমাতে পারত না।
নতুন খসড়া থেকে এই সাংবিধানিক সুরক্ষা সম্পূর্ণ বাদ দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বেতন-ভাতা আটকে রাখা বা কমিয়ে দেয়া একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগের সবচেয়ে কার্যকর ও নিঃশব্দ হাতিয়ার। সরকারের সমালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে কমিশনারদের বেতনে হাত পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থাকলে কমিশনের স্বাধীনতা চর্চা এমনিতেই স্তিমিত হয়ে যায়।
নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিশ্চিত আসন এখন ‘বিশেষ বিবেচনা’
কমিশনের গঠনে বহুত্ববাদের নিশ্চয়তাও শিথিল হয়েছে। ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত দুজন নারী কমিশনার এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন কমিশনার নিয়োগের বিধান ছিল। নতুন খসড়ার ধারা ৫(৩)-এ এই বাধ্যবাধকতাকে রূপান্তর করা হয়েছে বিবেচনামূলক ভাষায়—যোগ্য প্রার্থী থাকলে তাঁকে ‘বিশেষ বিবেচনায় রাখা যাইতে পারে’।
অর্থাৎ আইন লঙ্ঘন না করেই কমিশন সম্পূর্ণ পুরুষ সদস্য নিয়ে গঠিত হতে পারে। পার্বত্য জনপদের জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর কমিশনে কোনো নিশ্চিত প্রাতিষ্ঠানিক কণ্ঠ আর থাকছে না।
ইতিবাচক যা আছে, তার সুফলও শর্তসাপেক্ষ
খসড়ায় কিছু ইতিবাচক সংযোজনও রয়েছে। ধারা ৩৪ অনুযায়ী নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রোটোকল বাস্তবায়নে কমিশনের অধীনে একটি ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা বিভাগ’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই বিভাগ কারাগার, থানা, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ও মানসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসহ স্বাধীনতা হরণ করা হয় এমন স্থানে নিয়মিত ও পূর্ব-ঘোষণা ছাড়া পরিদর্শন করতে পারবে এবং বন্দিদের একান্ত ও গোপন সাক্ষাৎকার নিতে পারবে। এ ছাড়া কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনকে আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতাও যুক্ত হয়েছে।
যদিও এই সুফল অনেকটাই শর্তসাপেক্ষ। ঐচ্ছিক প্রোটোকল বিভাগের পরিদর্শন-তালিকায় সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার আটককেন্দ্র বা ‘আয়নাঘর’-এর মতো সম্ভাব্য গোপন স্থাপনার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে গোপন আটকের অভিযোগ, তাদের স্থাপনায় প্রবেশাধিকার স্পষ্ট না করলে পরিদর্শনের এই ক্ষমতা মূলত প্রচলিত কারাগার ও থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তাছাড়া ধারা ২০-এর কারণে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতাই যখন নেই, তখন প্রতিবেদনের সাক্ষ্যমূল্য বা ক্ষতিপূরণের ক্ষমতা কতটা কাজে আসবে, সেই প্রশ্নও রয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে।
‘এ-স্ট্যাটাস’ আরও দূরে সরে যাওয়ার শঙ্কা
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি প্রণয়ন করা হয়েছিল জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায়, বিভাগীয় পর্যায়ে অংশীজন পরামর্শ নিয়ে এবং GANHRI-র সুপারিশ অনুসরণ করে—যাতে কমিশন প্যারিস প্রিন্সিপলসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ‘এ-স্ট্যাটাস’ অর্জনের পথে এগোতে পারে। প্যারিস প্রিন্সিপলস হলো ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত মানদণ্ড, যা নির্ধারণ করে একটি জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হলে কীভাবে গঠিত হবে। মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, খসড়া আইনটি পাস হলে ‘এ-স্ট্যাটাস’ অর্জন বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে।
নাবিলা ইদ্রিস বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাধীনতা সংক্রান্ত ঘাটতিগুলোর কারণেই ২০০৯ সালে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পাস হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কখনোই ‘গ্যানরি’ (GANHRI – Global Alliance of National Human Rights Institutions)-এর রেটিংয়ে ‘স্ট্যাটাস বি’-এর উপরে উঠতে পারেনি; যা আসলে সর্বনিম্ন স্তর। (উল্লেখ্য, GANHRI-র রেটিংয়ে আগের ‘সি-স্ট্যাটাস’ রহিত হওয়ায় বর্তমানে ‘এ’ ও ‘বি’—এই দুটি স্তরই কার্যকর; ফলে ‘বি’ এখন কার্যত সর্বনিম্ন স্তর।) অথচ মালদ্বীপ বাদে প্রতিবেশী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন বর্তমানে ‘স্ট্যাটাস এ’-তে অবস্থান করছে। আমরা আজ পর্যন্ত এই স্তরে উন্নীত হতে পারিনি। এখন যেভাবে আইনটি সংশোধন বা লেখা হচ্ছে, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় যে আমাদের আবারও এই ‘স্ট্যাটাস বি’-তেই পড়ে থাকতে হবে। কারণ এই বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক নীতিমালার সরাসরি পরিপন্থী এবং এটি দালিলিকভাবে প্রমাণিত।
একই ছাঁচে দুর্বল হচ্ছে ‘গুম কমিশন’ও
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও ‘গুম কমিশন’ আইনি কাঠামো এবং কার্যকারিতার দিক থেকে দুটি ভিন্ন সত্তা হলেও, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এদেরকে ‘একই বৃন্তের দুটি ফুল’ বা একই লক্ষ্যের পরিপূরক দুটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন হলো একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার কাজ রাষ্ট্রের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নজরদারি করা এবং সব ধরনের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তোলা। অন্যদিকে, ‘গুম কমিশন’ হলো ‘বলপ্রয়োগপূর্বক গুম’-এর মতো একটি সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহতম লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করার জন্য গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্স। গুম কমিশনকে যেভাবে আইনিভাবে শক্তিশালী করার কথা বলে আরও দুর্বল করে দেয়া হচ্ছে, মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রেও ঘটছে ঠিক একই ঘটনা।
খসড়া সম্পর্কে জানে না বিরোধী দল, আইনের সমালোচনায় খোদ সরকারি দলের এমপি
বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, যিনি একইসাথে বিরোধী দল থেকে মনোনীত হয়ে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, খসড়া আইনটির অনুলিপি এখনো আমরা হাতে পাইনি। বিষয়টি সংসদীয় কমিটিতেও এখনো ওঠেনি। সরকার বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনদের সাথে এই আইনটি নিয়ে সংলাপ বা আলোচনা করছে। যদিও সেই আলোচনা বা কোনো প্রক্রিয়ায় এখনো আমাদেরকে ডাকা হয়নি। ফলে এই বিষয়ে পুরোপুরি মন্তব্য করা কঠিন। তবে পুরনো যে আইনটি রয়েছে, সেটিকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পরিমার্জন করে আনা যেত। নতুন এই আইনটি যদি আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও নিয়মনীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে এটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার যে মূল বিষয়গুলো—বিশেষ করে সংস্কার ও বিচার, সেগুলোকে যদি এই আইনে সঠিকভাবে মূল্যায়ন বা অ্যাড্রেস করা না হয়, তবে দেশের সাধারণ জনগণ এটি ভালোভাবে গ্রহণ করবে না।
এ বিষয়ে আরও কথা হয় আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সাথে, যিনি সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। খসড়া এই আইনকে দুর্বল আইন আখ্যা দিয়ে খোদ সরকারদলীয় এই সংসদ সদস্য দি ইনসাইটাকে বলেন, মানবাধিকার রক্ষা ও নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হবে। তদন্ত বা কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি কিংবা অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে থাকলে কমিশন তার মূল উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। ক্ষমতায় যে সরকারই থাকুক না কেন, যেকোনো সরকারের স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে নিজেদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষা করা। তাই কমিশনকে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা প্রয়োজন, যাতে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশনের রূপরেখা ও কার্যপরিধি ১৯৪৮ সালের ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (Universal Declaration of Human Rights)-এর আন্তর্জাতিক নীতির আলোকে গঠিত হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড অনুসরণ করলেই কেবল কমিশন একটি বিশ্বস্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে।





