অভিযুক্তরাই করবেন গুমের তদন্ত, দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে নির্দেশদাতাকে
গুম ঠেকাতে যে আইন প্রশংসিত হয়েছিল, তা বাতিল করে সরকার আনছে আরও দুর্বল খসড়া। অভিযুক্তরাই করবেন এখন তদন্ত। নির্দেশদাতারা পাচ্ছেন দায়মুক্তি। তাহলে কি জবাবদিহিতা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্র নিজেই?
অন্তবর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ রহিত করার সময় শক্তিশালী আইনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে অত্যন্ত দুর্বল আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। নতুন আইনে দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে গুমের নির্দেশদাতাদের। যেকোনো স্থানে তল্লাশির সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তাদেরকেই, অর্থ্যাৎ পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে তদন্তের।
The draft law to stop enforced disappearances is indeed granting immunity to those in command of enforced disappearances. The authority of raiding secret detention centers is being curbed as well. The duty to conduct investigation goes to those who are alleged of the disappearance from among the police or other law enforcing agencies. Although strong laws were promised by the BNP-led government when the ordinance issued by the interim government was already repealed, in reality the current government is going to adopt very weak laws.
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার একই বছর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে। যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গুমকে একটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অধ্যাদেশকে ভুক্তভোগীদের জন্য একটি বড় আইনি অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার এই অধ্যাদেশ পাসের পরিবর্তে এটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যেতে দেয়। এর বদলে সংসদে যে নতুন খসড়া আইন উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে, দি ইনসাইটার পর্যালোচনায় দেখা গেছে তা কাঠামোগতভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল। একাধিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিজেই জবাবদিহিতা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুমের মতো অপরাধের তদন্ত স্বাধীন কমিশন বা সংস্থা দিয়ে করা হলেও বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। বিগত সময়গুলোতে যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে এবং প্রমাণও পাওয়া গেছে, তাদেরকেই দেয়া হচ্ছে গুমের ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব। পাশাপাশি গুমের নির্দেশদাতা বা উর্ধ্বতন কমান্ডিং অফিসারও দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে অত্যন্ত একটি দুর্বল কাঠামো দেয়া হচ্ছে নতুন প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনে। আইনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। এটি সংসদে পাশ হলে গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের আইনিভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মীরা। খোদ সরকার দলীয় একাধিক সংসদ সদস্য খসড়া আইনটিকে দুর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইন কাঠামোগতভাবে অনেক বেশি দুর্বল, যদিও অধ্যাদেশটি বাতিলের সময় এর চেয়েও শক্তিশালী আইন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার। । খসড়ায় বেশ কিছু গুরুতর আইনি ফাঁকফোকরও রাখা হয়েছে। বিশেষ করে, যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিগত পনেরো বছর ধরে গুমের মূল অভিযোগ উঠেছে, নতুন খসড়ায় সেই বাহিনীর হাতেই গুমের তদন্তভার ন্যস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে সাজা বাড়ানো হলেও, অপরাধের তদন্ত ও প্রমাণের মূল হাতিয়ারগুলোকেই এই খসড়ায় অকার্যকর করে দেয়া হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ও সরকার দলীয় এমপি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দি ইনসাইটাকে বলেন, একটি বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং গুমের মতো অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সরকারকে কেবল একটি দুর্বল আইন না করে একটি দৃষ্টান্তমূলক, কঠোর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন প্রণয়ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের খসড়া আইনে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে তদন্ত সংস্থার স্বাধীনতায়। নতুন প্রস্তাব করা আইনের ধারা ১৪(১) অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ গ্রহণ করবেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং তদন্ত পরিচালিত হবে সাধারণ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে। যা পরিচালিত হবে থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর বা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এটিকে অনেকে হাস্যকর বলে মনে করছেন।
উল্লেখ্য, সদ্য বিলুপ্ত গুম কমিশনে মোট ১ হাজার ৬০০টি গুমের অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে শুরুতেই প্রাথমিকভাবে ৩৮৩টি অভিযোগের যাচাই করা হয়েছিল। এসব অভিযোগের মধ্যে র্যাবের বিরুদ্ধে ১৭২টি, সিটিটিসির বিরুদ্ধে ৩৭টি, ডিবির বিরুদ্ধে ৫৫টি, ডিজিএফআইয়ের বিরুদ্ধে ২৬টি, পুলিশের বিরুদ্ধে (সরাসরি) ২৫টি এবং অন্যান্য বাহিনীর বিরুদ্ধে ৬৮টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এখানে “ডিবি” এবং “সিটিটিসি”ও পুলিশেরই অংশ হলেও কমিশন এগুলোকে আলাদা ক্যাটাগরিতে দেখিয়েছে। পুলিশ-সম্পর্কিত সবগুলো ইউনিট একসাথে ধরলে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি গুমের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে রয়েছে। এছাড়া, বিগত পনেরো বছরে দাখিলকৃত প্রায় ১,৯০০টি গুমের অভিযোগের মধ্যে মাত্র ২৫০টিতে সমসাময়িক সাধারণ ডায়েরি বা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড ছিল। অর্থাৎ বিগত সময়গুলোতে পুলিশ প্রশাসন গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মামলা বা জিডিই গ্রহণ করতে চায়নি।
যে পুলিশ-কাঠামো দেড় দশক ধরে গুমের রেকর্ড গোপন করতে বা এড়িয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে (যেমনটি একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে), এখন সেই পুলিশের সাধারণ একজন কর্মকর্তার কাঁধেই দেয়া হচ্ছে গুমের স্পর্শকাতর তদন্তভার। একজন সাধারণ এসআই-এর পক্ষে কর্মরত কোনো শীর্ষ সামরিক বা গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত করা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, বেসামরিক ও বিশেষায়িত ‘গুম কমিশন’ গঠিত হয়েছিল। জারি করা অধ্যাদেশে বিধান অনুযায়ী, কমিশনের নিজস্ব তদন্তকারী দল ছিল এবং তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যেকোনো তদন্ত পরিচালনা করতে পারতেন।
প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বেশ কিছু গুরুতর আইনি ত্রুটি ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা স্টেট অ্যাক্টরদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে, শুরুতেই তার তদন্ত একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে হওয়া উচিত। অভিযুক্ত বাহিনীর হাতেই যদি তদন্তের ভার দেওয়া হয়, তবে সেই তদন্ত কখনোই নিরপেক্ষ হয় না। যেমনটা অতীতে র্যাব, পুলিশ, ডিবি বা বিজিবির ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রমাণিত। ফলে ভিকটিম ও তাঁদের পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) দক্ষিণ এশিয়ার সাবেক পরিচালক ও এশিয়া মহাদেশের বর্তমান উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি দি ইনসাইটাকে বলেন, যে কোনো নতুন আইনকে অবশ্যই গুমের মত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো নিষিদ্ধ করা এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। তিনি বলেন, হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিতভাবে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। যেহেতু বাংলাদেশ পুলিশও এই ধরনের নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত, তাই তাদের মানবাধিকার বিষয়ক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা উচিত।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরো বলেন, র্যাবের মতো ইউনিটে নিযুক্ত হয়ে বা তাদের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে, কোনোভাবেই সামরিক বাহিনীকে দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগে জড়িত করা উচিত নয়। তারেক রহমান সরকারের উচিত র্যাবকে বিলুপ্ত করা, যারা সর্বপ্রথম এই নির্যাতন শুরু করেছিল। যা পরে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
গুমস্থল বা “আয়ানাঘর” পরিদর্শনের ক্ষমতা বিলোপ
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্বাধীন গুম কমিশনকে যেকোনো গোপন আটকস্থল, রিমান্ড হোম বা কারাগারে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আকস্মিক প্রবেশ ও পরিদর্শনের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়ায় এই ক্ষমতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে যুক্ত করা হয়েছে আদালত-নির্ভর ‘তল্লাশি পরোয়ানা’। বিশ্লেষকরা বলছেন, গুমের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার তো জানেই না যে, তাদের স্বজন কোন বাহিনীর কোন গোপন টর্চার সেলে বা ‘আয়নাঘরে’ বন্দী আছেন। যেখানে সুনির্দিষ্ট তথ্যই নেই, সেখানে পরিবারের পক্ষে আদালতে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানের উল্লেখ করে তল্লাশি পরোয়ানা চাওয়া একটি অবাস্তব ও হয়রানিমূলক আইনি ফাঁদ। এর ফলে পরবর্তী কোনো গোপন আটকস্থল চিহ্নিত করার পথগুলোও কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রস্তাবিত আইনে গুমস্থল বা ‘আয়নাঘর’ ও গোপন ডিটেনশন সেন্টারগুলো পরিদর্শনের ক্ষমতা কাটছাঁট বা বিলুপ্ত করারও তীব্র সমালোচনা করেছেন সাজ্জাদ হোসেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সনদ অনুসরণ করে আইন করতে হলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে অনুসন্ধানকারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। গোপন বন্দিশালাগুলোতে যদি তদন্তকারীদের অবাধ প্রবেশাধিকার না থাকে, তবে নিখোঁজদের খুঁজে বের করার পুরো প্রক্রিয়াটিই বায়বীয় এবং অকার্যকর হয়ে পড়বে। এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করা না হলে আইনটি তার মূল কার্যকারিতা হারাবে এবং বছরের পর বছর ধরে ভিকটিমদের পরিবারের যে আর্তনাদ, তা অপূর্ণই থেকে যাবে। ফলে তাঁদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিও আর আলোর মুখ দেখবে না বলেও মন্তব্য করেন জনাব হোসেন।
গুমের নির্দেশদাতার দায়মুক্তি
বিগত অধ্যাদেশে কোনো অধস্তন কর্মকর্তা গুম করলে, তার ঊর্ধ্বর্তন বা নির্দেশদাতা কমান্ডিং অফিসারও সমভাবে অভিযুক্ত হতেন- যদি প্রমাণ হতো যে, অপরাধের বিষয়টি তাঁর জানার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনের ধারা ১০ থেকে এই ‘জানার যুক্তিসঙ্গত কারণ’ ভিত্তিটি বাদ দেয়া হয়েছে। এখন কেবল সরাসরি লিখিত বা প্রমাণিত মৌখিক নির্দেশ ছাড়া শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করা যাবে না। বাস্তবে গুমের মতো অপরাধের নির্দেশ কখনো লিখিত বা প্রকাশ্য হয় না। এই পরিবর্তনের ফলে কমান্ড চেইনের উপরের তলার হোতারা এক প্রকার অলিখিত দায়মুক্তি পেয়ে গেলেন।
মানবাধিকারকর্মী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বর্তমান প্রস্তাবিত আইনে প্রধান দুটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতার সংজ্ঞাটিকে অত্যন্ত হালকা বা দুর্বল করে দেয়া হয়েছে। যার ফলে বাহিনীর প্রধানদের আইনের আওতায় আনার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে যে মানবাধিকার কমিশন বা কোনো সাধারণ কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তদন্ত করতে পারবে না। বরং এই তদন্তভার দেয়া হবে পুলিশের একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে। একজন সাব-ইন্সপেক্টরের পক্ষে কোনো মেজর জেনারেল, ডিজিএফআই বা এনএসআই প্রধান কিংবা র্যাবের সিইও-র মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন সাজা ও ভিকটিমের জীবনের ঝুঁকি
নতুন খসড়া আইনের ধারা ৫-এ অপরাধের মূল সাজা ‘অনধিক’ থেকে পরিবর্তন করে ‘অন্যূন’ (অন্যূন ১০ বছর কারাদণ্ড) অর্থাৎ সর্বনিম্ন সাজা নির্ধারণ করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে একে কঠোর আইন মনে হলেও এর একটি ভয়াবহ উল্টো দিক রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধী বা পারপেট্রেটর যদি জানে যে ধরা পড়লে তাকে ন্যূনতম ১০ বছর সাজা খাটতেই হবে, তবে সে ভিকটিমকে জীবিত ফিরিয়ে দেয়ার চেয়ে প্রমাণ লোপাটের জন্য ভিকটিমকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার (হত্যা করার) পথ বেছে নিতে পারে। ফলে এই বিধান ভিকটিমের জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান থাকা অত্যন্ত জরুরি। সাজা কম কিংবা ঐচ্ছিক হলেও শাস্তির ভয় মানুষকে অনেক অন্যায় করা থেকে বিরত রাখে। তাই এই আইনের শাস্তির বিধানটি একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু এর বাকি অংশ যদি পূর্বের মতো বহাল থাকত, তবে তা কার্যকর বা যথেষ্ট হতে পারত। এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভিকটিম তহবিল ও ডাটাবেজ হাতছাড়া
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য একটি স্বাধীন সংস্থার অধীনে ‘ভিকটিম তহবিল’ ও ‘নিখোঁজ ডাটাবেজ’ পরিচালনার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়ার ধারা ৩০ অনুযায়ী, এই তহবিল ও ডাটাবেজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়া হয়েছে সরকারের হাতে। যেখানে রাষ্ট্রের নিজস্ব বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, সেখানে স্বাধীন তত্ত্বাবধান ছাড়া সরকারি আদেশে ক্ষতিপূরণ বণ্টন ও তথ্যভান্ডার পরিচালনা করা কনফ্লিক্ট অব ইনটারেস্ট বা স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুম এবং এখতিয়ারের আইনি ফাঁদ
২০২৬ সালের নতুন খসড়া আইনের ৪ নম্বর ধারায় নতুন আরেকটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুম’-কে সরাসরি এই আইনের সাধারণ সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। খসড়ার ৩৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এই ধরনের পদ্ধতিগত অপরাধগুলোকে সরাসরি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর অধীনে বিচার করার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের মূল অধ্যাদেশে এই এখতিয়ারের বিষয়টি ছিল অনুসন্ধান-পরবর্তী এবং পদ্ধতিগত। অর্থাৎ কমিশন নিজেই তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত নিত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে যাবে কি না। কিন্তু নতুন খসড়ায় মামলার শুরুতেই এই সীমারেখা টেনে দেয়ায় অভিযুক্ত পক্ষ আইনি সুবিধা পাবে। কোনো গুমের ঘটনা আসলেই ব্যাপক বা পদ্ধতিগত কি না, তা প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া শুরুতেই সুনির্দিষ্টভাবে বলা অসম্ভব। এর ফলে, প্রভাবশালী অভিযুক্তরা মামলার শুরুতেই ‘এটি এই আইনের এখতিয়ারভুক্ত নয়, ট্রাইব্যুনালের বিষয়’- এমন যুক্তি তুলে উচ্চ আদালতে রিট বা আপিল করার সুযোগ পাবে। এই এখতিয়ার বিতর্কের কারণে মূল মামলার কার্যক্রম শুরুতেই থমকে যাবে এবং বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হবে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, গুম কোনো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। এটা একটা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুতর অপরাধ, যেখানে স্টেট মেশিনারিজ ইনভলভড থাকে। এটি যখন পদ্ধতিগত ও ব্যাপকভাবে ঘটে, তখন তা মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল হয়ে যায় এবং সেটা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে। কিন্তু যেগুলো স্পোরাডিক ইনসিডেন্ট, ওগুলোও তো একইভাবে ট্রিট করতে হবে। তাই এই ধরনের স্পর্শকাতর অপরাধের বিচারে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন না করে একে সাধারণ দায়রা জজ আদালতের অধীনে আনা এবং সমকক্ষ পদের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত না করানো অত্যন্ত বড় একটি ঘাটতি।
তদন্তে সরকারি কর্মকর্তার অবহেলার সাজার ধারা বিলোপ
বিগত ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের ২৬ নম্বর ধারায় একটি বিধান ছিল, যেখানে ট্রাইব্যুনাল বা গুম কমিশনের কোনো আদেশ অমান্য করলে, তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা তদন্তে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা বাহিনীর সদস্য অবহেলা করলে তাকে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে দ্রুত অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা জরিমানা করার ক্ষমতা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন খসড়া আইন থেকে দ্রুত ও ব্যক্তিগতভাবে কার্যকরযোগ্য এই বিশেষ ধারাটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে আদেশ অমান্যের পুরো বিষয়টিকে সাধারণ ফৌজদারি কার্যবিধির অবমাননা বিধানের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, গুমের অপরাধে যারা আদেশের মুখোমুখি হন, তাঁরা মূলত প্রভাবশালী রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে যেকোনো আদেশকে বিলম্বিত করার। অধ্যাদেশে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে দ্রুত সাজার যে ভয় ছিল, তা এই কর্মকর্তাদের তথ্য দিতে বা আদেশ মানতে বাধ্য রাখত। এখন সাধারণ অবমাননা মামলার দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা তদন্তের নথিপত্র বা তথ্য সরবরাহ না করে মাসের পর মাস পার করে দেয়ার আইনি সুযোগ পেয়ে যাবেন ফলে গুমের মতো স্পর্শকাতর অপরাধের তদন্তকে পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনটি মূলত একটি ‘শুভংকরের ফাঁকি’। এটি কাগজে-কলমে মৃত্যুদণ্ড ও ন্যূনতম সাজার কথা বলে সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিচ্ছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে, আটকস্থল পরিদর্শনের পথ বন্ধ করে এবং কমান্ড অফিসারকে দায়মুক্তি দিয়ে অপরাধীদের সুরক্ষার বলয় তৈরি করছে। খসড়া এই আইনটি সংসদে পাস হলে গুমের শিকার পরিবারগুলো কখনোই ন্যায়বিচার পাবে না বলে আশঙ্কা তাদের।
এক্ষেত্রে তাদের সুপারিশ গুমের তদন্তের জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, বেসামরিক ও বিশেষায়িত তদন্ত কমিশন বা সংস্থা গঠন করতে হবে। বাহিনী প্রধান বা অভিযুক্ত বাহিনীর কোনো সদস্য কোনোভাবেই তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারবেন না। যেকোনো সন্দেহভাজন গোপন আটকস্থলে কমিশনের স্বতঃপ্রণোদিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের ক্ষমতা পুনর্বহাল করতে হবে। রোম সংবিধি অনুসারে ঊর্ধ্বতনের কমান্ড দায়িত্ব আইনি ধারায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভিকটিম তহবিল ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের ডাটাবেজ পরিচালনার ভার সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে একটি স্বাধীন ট্রাস্টি বা সংস্থার হাতে দিতে হবে।
‘লজ্জাজনক ও অকার্যকর আইন’ বলছেন আরমান, নিশ্চুপ তুলি
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দুই পরিচিত আইনি সহযোদ্ধা জামায়াতের ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এবং মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা আক্তার তুলি। মানবাধিকারের লড়াই ভুক্তভোগী এই দুটি মানুষের জীবনের গল্প গুমের এক পরম বেদনায় গাঁথা। ব্যারিস্টার আরমান নিজেই ২০১৬ সাল থেকে দীর্ঘ আট বছর গুমের শিকার হয়ে ‘আয়নাঘরে’ বন্দি ছিলেন। আর সানজিদা আক্তার তুলির নিজের বড় ভাই, বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমন ২০১৩ সাল থেকে আজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। নানা সময় তুলি বলেছিলেন, ব্যারিস্টার আরমানের শরীর থেকে তিনি তার ভাইয়ের গন্ধ পান। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর আরমান মুক্ত বাতাসে ফিরে আসলেও তুলির ভাইয়ের সন্ধান আজও মেলেনি। ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুখোমুখি হলেও একইরকম ক্ষত ও দীর্ঘ লড়াই মূলত এই দুই প্রার্থীকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে একে অপরের পরম শুভাকাঙ্ক্ষীতে পরিণত করেছে। ব্যারিস্টার আরমান জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং সানজিদা আক্তার তুলি বিএনপির নারী সংরক্ষিত আসন থেকে মনোনীত সংসদ সদস্য। দুজনেই আইনপ্রণেতা। দু’জনেই ভুক্তভোগী। কিন্তু একজন মুখ খুলছেন খসড়া আইনের বিষয়ে। আরেকজন নিশ্চুপ।
দি ইনসাইটার পক্ষ থেকে এই বিষয়ে মতামত নিতে কয়েকবার যোগাগোগ করা হয় সানজিদা আক্তার তুলির সাথে। তিনি প্রশ্নও পাঠাতে বলেন। প্রশ্ন পাঠিয়ে টানা দুইদিন চেষ্টা করা হলেও এই বিষয়ে তিনি কথা বলেননি। অন্যদিকে ব্যারিস্টার আরমান প্রস্তাবিত খসড়া এই আইনকে একটি লজ্জাজনক ও অকার্যকর আইন বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্যারিস্টার আরমান দি ইনসাইটাকে বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করতে গড়িমসি করে বা নিতেই চায় না। যেখানে পুলিশ প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়াই শুরু করতে অনীহা প্রকাশ করে, সেখানে তাদের মাধ্যমেই এই অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত আশা করা অবাস্তব এবং এর ফলে আইনটির মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
তিনি বলেন, গুমের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধের সঠিক এবং নিরপেক্ষ তদন্ত কেবল তখনই সম্ভব, যখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি স্বাধীন ‘গুম কমিশন’ বা কোনো নিরপেক্ষ সংস্থাকে এই দায়িত্ব দেয়া হবে।
ব্যারিস্টার আরমান আরো বলেন, প্রস্তাবিত নতুন আইনে লিখিত অনুমতি বা আদেশের ভিত্তিতে গুমের ঘটনার তদন্ত করার যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, তা মূলত এই আইনের মূল উদ্দেশ্যকেই পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিচ্ছে। যদি কেবল আদেশের ওপর ভিত্তি করেই তদন্তের সুযোগ থাকত, তবে বিগত ১৭ বছরে ঘটে যাওয়া সব গুমের ঘটনারই তদন্ত সম্পন্ন হতো। কারণ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো কোনো না কোনোভাবে মামলা বা অভিযোগ ঠিকই দায়ের করেছিল। বাস্তব সত্য হলো, এই ধরনের আদেশের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ যাদের নির্দেশে বা ইশারায় গুমের মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে, তারা কখনোই নিজে থেকে এই তদন্তের নির্দেশ বা অনুমতি দেবে না। আর যদি কখনো চাপ বা বাধ্য হয়ে তারা তদন্তের অনুমতি দেয়ও, তবে তার আগে সব ধরনের তথ্য-প্রমাণ গায়েব বা ধ্বংস করেই তা দেবে।
ব্যারিস্টার আরমান বলেন, লিখিত আদেশের এই আইনি শর্তটি নতুন আইনের কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেবে। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সরকারের ভেতরে একটি প্রভাবশালী মহল বা ‘ডিপ স্টেট’ সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রটি দেশে গুমের বিচার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে যে সব সংস্কারের চেষ্টা চলছে, সেগুলোকে ভেতর থেকে নস্যাৎ করতে চায়। আর এই লিখিত আদেশের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করাটাই তার অন্যতম বড় প্রমাণ। সামগ্রিকভাবে পুরো আইনটি বিবেচনা করলে এটি একটি লজ্জাজনক বা প্রহসনমূলক অকার্যকর আইন বলে মনে হয়। এই আইনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া মানুষ কিংবা গুম হওয়া ব্যক্তিদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বাস্তবে কোনো সুফল বা প্রতিকার পাবে না বলে মনে করেন ব্যারিস্টার আরমান।
আইনের কঠোর সমালোচনায় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন
এ বিষয়ে আরো কথা হয় আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য ও সরকার দলীয় এমপি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সাথে। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, আইনটি যতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত ছিল, বর্তমানে ততটা সুদৃঢ় করা হচ্ছে না বলে বিতর্ক রয়েছে। একটি বিচারব্যবস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এবং গুমের মতো অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সরকারকে কেবল একটি দুর্বল আইন না করে একটি দৃষ্টান্তমূলক, কঠোর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি বলেন, যেকোনো আইনই কোনো নির্দিষ্ট সরকারের সুবিধার জন্য নয়, বরং দেশের সার্বিক মঙ্গল ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের কথা বিবেচনা করে প্রণয়ন করা উচিত। তাই গুম প্রতিরোধের জন্য আইনটি সর্বজনীন, যথেষ্ট কঠোর ও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অন্যায় করার সাহস না পায়। আইনটিকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আইনের খসড়াটি প্রতিরোধমূলক ও দৃষ্টান্তমূলক হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সনদ লঙ্ঘন
বাংলাদেশ জাতিসংঘের অপক্যাট বা নির্যাতন বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের ঐচ্ছিক প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের একটি আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে যে, দেশে একটি জাতীয় নির্যাতন প্রতিরোধ সংস্থা গঠন করতে হবে। এই সংস্থার মূল কাজ হলো কোনো পূর্ব নোটিশ বা অনুমতি ছাড়াই দেশের যেকোনো বন্দিশালা ও আটক কেন্দ্রে সরাসরি প্রবেশ করে তা পরিদর্শন করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতিটি সফলভাবে কার্যকর হওয়ার কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এটি সবাই গ্রহণ করছে।
তবে প্রস্তাবিত খসড়া আইনে এই সংক্রান্ত বিধানটি বাতিল করার ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সেই আন্তর্জাতিক আইনের সাথে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থানে চলে গেছে। এমন কোনো স্বাধীন তদারকি বা পরিদর্শন ব্যবস্থা না থাকলে বিশেষ করে ক্ষমতাধর বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা বাহিনীর (যেমন: র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই) নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্দিশালাগুলো নজরদারির বাইরে থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে যে, এই ধরনের তদারকি ব্যবস্থা না থাকার সুযোগেই বিভিন্ন গুমের ঘটনা ঘটে এবং বন্দিদের গোপন স্থানে আটকে রাখা হয়।
এই বিষয়ে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, বিধানটি বাতিল হওয়ার কারণে কেবল যে দেশীয় আইনের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে তা নয়, বরং জাতিসংঘের সাথে বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিশ্রুতি ছিল তাও লঙ্ঘিত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ এখন একটি নন-কমপ্লায়েন্ট অর্থাৎ আইন বা চুক্তি অমান্যকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ যে রোম স্ট্যাটিউটের পক্ষরাষ্ট্র, সেই আলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের সেকশন ৪(৩)-এ এই দায়বদ্ধতা স্পষ্টাক্ষরে ডিফাইন করা ছিল। বাংলাদেশ অলরেডি গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে, যার সেকশন ২ ও ৩ অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়ন করা আমাদের জন্য একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। নতুন আইনের যে খসড়া তৈরি করেছে সরকার, তার মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন এরইমধ্যে লঙ্ঘন করেছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী জোর দিয়ে বলেন যে, নতুন যেকোনো আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দ্রুত তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
বাংলাদেশে গঠিত গুম তদন্ত কমিশন এ পর্যন্ত ১,৫৬৯টি অভিযোগ সক্রিয়ভাবে পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে ২৫১টি ক্ষেত্রে ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ এবং ৩৬টি ক্ষেত্রে গুমের পর ব্যক্তি ফিরে এসেছেন। তদন্তের সময় ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং ৭৬৫ জন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে, কারণ তারা এই বাহিনীকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ নথিভুক্ত ঘটনার জন্য দায়ী বলে চিহ্নিত করে। এছাড়া ডিজিএফআই এর মতো গোয়েন্দা সংস্থার কার্যত দায়মুক্তি বাতিল, ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা প্রদানের সুপারিশও করা হয়।






