স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ে “বাক্সবন্দি” জামায়াত, তৃণমূলে ক্ষোভ-বিভক্তি
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতের প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় কাঠামোই কি প্রাধান্য পাচ্ছে? তাহলে কি উপেক্ষিত হচ্ছে জনমত? এ নিয়ে তৃণমূল জামায়াতে নানা ক্ষোভ -বিভক্তির খবর উঠে এসেছে দি ইনসাইটার অনুসন্ধানে।
Although local government elections have yet to be announced, Bangladesh Jamaat-e-Islami has begun selecting candidates. How are these nominations made? Are internal considerations prioritized over public support, and how confident are grassroots leaders? An Insighta investigation finds growing dissatisfaction and divisions within the party’s base, raising concerns about transparency, representation, and internal cohesion.
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশের বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে প্রার্থী ঘোষণা করতে শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রার্থী চূড়ান্ত করা হচ্ছে সিটি করপোরেশনগুলোতেও। তবে প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ। এ নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই শুরু হয়েছে নানা সমালোচনা। দলীয় সূত্র বলছে, তৃণমূল পর্যায়ে নানা ধরনের কোরাম ও বিভক্তি শুরু হয়েছে স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার কারণে স্থানীয় নির্বাচনেও দলের টিকিট পেতে এখন দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। এনিয়ে নানা ধরণের বিশৃঙ্খলাও দেখা দিয়েছে দলটির অভ্যন্তরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমদ দি ইনসাইটাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনে দল ও মতাদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আরো অনেক সমীকরণ কাজ করে। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে একটা দলকে সমর্থন দেওয়া ভোটার স্থানীয় নির্বাচনেও একই দলের প্রার্থীকেই ভোট দেবে- এমন নাও হতে পারে। এখানে মানুষ প্রতীক বা দলের বাইরেও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি, মানুষের সাথে সম্পর্ক, সুখ-দুঃখে কাছে পাওয়া, স্থানীয় সমস্যা বোঝা ও সমাধানের যোগ্যতা, এবং সামগ্রিকভাবে দলীয় অবস্থানের চেয়ে সামাজিক-রাজনৈতিক অব্যস্থানকে গুরুত্ব দেয়। তিনি মনে করেন, জামায়াত এসব সামাজিক-রাজনৈতিক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাকে বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী মনোনয়ন চুড়ান্ত করবে। শুধু দলীয় পদ-পদবী, দলে জ্যেষ্ঠতা বা দলের ভেতরে জনপ্রিয় হলেই একজন ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় নাও হতে পারেন। প্রার্থী সিলেকশনে (বাছাইয়ে) ভুল হলে স্থানীয় নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নাও আসতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
জামায়াতের দলীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চূড়ান্ত প্রার্থীর নামও ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জুবায়ের দি ইনসাইটাকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে আমরা তৃণমূল থেকে পরামর্শ গ্রহণ করি। এটা একেবারে ইউনিয়ন, পৌরসভা থেকে উপজেলা পর্যন্ত। এরপর একটা প্যানেল তৈরি করি। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ভোট হয়। সর্বশেষ জেলা সংগঠন কাকে প্রার্থী করবে তারা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এই কাজ এখন পুরো দেশে চলমান। আর সিটি করপোরেশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে কেন্দ্র।’
বিভিন্ন জেলায় জামায়াতের তৃণমূল নেতকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দলটির এসব কাঠামোগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীরা মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন। এরমধ্যে প্রক্রিয়াগত নানা জটিলতা ও দুর্বলতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে দি ইনসাইটার অনুসন্ধানে।
যোগ্যতা বনাম দলীয় পদবী
নোয়াখালী পৌরসভায় মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে দলের পৌর আমীর মোঃ ইউসুফের নাম। যদিও ভোটের মাঠে তার অবস্থান নিয়ে সন্দিহান খোদ দলেরই একাংশ। তিনি একজন স্কুল শিক্ষক। আর্থিক সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের সাথে তার দূরত্বই এখানে বড় বাধা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতে, দলীয় কাঠামোর বাইরে তার কোনো পরিচিতি নেই বললেই চলে। বিপরীতে, নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম কিংবা অ্যাডভোকেট মাইনুদ্দিন খসরুর মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের উপেক্ষা করায় নেতা-কর্মীরা হতাশ।
তাদের মতে, যারা এতদিন জনগণের কাছাকাছি থেকেছেন, বিভিন্ন সমাজিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন, নানাভাবে মানুষের সাথে মিশেছেন- তাদেরকে বাদ দিয়ে কেবল দলের ভেতরের পদবী বিবেচনায় একজন স্বল্প পরিচিত ব্যক্তিকে প্রার্থী করা দলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবকেই ফুটিয়ে তুলছে। যদিও এ প্রসঙ্গে সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জুবায়ের বলেন, “জামায়াত দলীয় পদকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী করে, কথাটা সত্য নয়। অনেক সময় দলীয় পদধারীদেরকে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়, সেখানে বরং অনেক সাধারণ কর্মীকেও প্রার্থী করা হয়।”
রাজশাহী অঞ্চলের বেশকিছু স্থানেও প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে জামায়াত। রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভায় মেয়রপদে থানা সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল হাই এর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এনিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় তীব্র অসন্তোষ। নেতাকর্মীদের চাপে প্রার্থী পরিবর্তন করে মিজানুর রহমানকে মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয় জামায়াত। যদিও তিনি জামায়াতের রূকন নয়।
মৌলভীবাজার জুড়ি উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করা হয়েছে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আজিজ আহমেদ কিবরিয়াকে। এটা নিয়ে দলের অভ্যন্তরে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। তার বিপরীতে সেখনকার পরিচিত মুখ আব্দুল মুনিম হেলালকে প্রার্থী করার দাবি উঠেছে স্থানীয় জামায়াতের পক্ষ থেকে। তিনি ভোটের মাঠে পরিচিত মুখ ও জামায়াতের কর্মী। কিন্তু রুকন না হওয়ায় তাকে প্রার্থী করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে জেলা জামায়াত। এনিয়ে জামায়াতের জেলা কমিটির অভ্যন্তরেই তীব্র মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের একাধিক নেতা দি ইনসাইটাকে এ তথ্য নিশ্চিত করলেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি কেউ। তারা বলছেন, দলের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বললে রুকন পদ বাতিল হয়ে যাবে।
মৌলভীবাজার পৌরসভা ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়েও বিপাকে পড়েছে জামায়াত। কমলগঞ্জ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে প্রার্থী করা হয়েছে। তবে তিনি নিজেই নির্বাচন করবেন না বলে দলকে জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, মৌলভীবাজার পৌরসভায় প্রার্থী হতে চান ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি মৌলভীবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক পদে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে প্রার্থী না করে উল্টো তার রুকন পদ স্থগিত করেছে জামায়াত।
মৌলভীবাজারের জুড়ী আল ফালাহ ইসলামিক একাডেমির ভৌত বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক সরওয়ার কামাল সিদ্দিকি দি ইনসাইটাকে বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে জামায়াতের ব্যাপারে যে কথাগুলো শোনা যাচ্ছে, এগুলো মোটেও সুখকর নয়। জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে যোগ্য লোককেই প্রার্থী করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
ভোটের মাঠে ‘অপরিচিত’ মুখ
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ছয়ানি ইউনিয়নে উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোঃ আব্দুর রহিমকে প্রার্থী করা হলেও স্থানীয় জনমতের প্রতিফলন সেখানে ঘটেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ভোটারদের মতে, দলীয় পরিচয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক কম। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান কিংবা জনপ্রিয় ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে দল কেন একজন ‘অপ্রস্তুত’ প্রার্থীকে বেছে নিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। কর্মীদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তের ফলে জামায়াতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই ইউনিয়নে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সদর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে প্রার্থী হিসেবে ‘শহীদ স্যার’ নামে এক শিক্ষকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, যাকে দলের সাধারণ কর্মীরাই ঠিকমতো চেনে না। জনগণের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই, তাকে ভোটযুদ্ধে নামানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। এখানে প্রবাসী মাসুম, ডাক্তার আলী আশরাফ কিংবা বর্তমান মেম্বার শাকিল সওদাগরের মতো বিকল্প থাকা সত্ত্বেও তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ খোদ জামায়াত কর্মীদের। এ বিষয়ে বিনোদপুর ইউনিয়নের জামায়াতকর্মী আবদুল্লাহ আল মামুন দি ইনসাইটাকে বলেন, দল যাকেই প্রার্থী করবে- আমরা তার হয়েই মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাব। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার সময় অভ্যন্তরীন আলোচনায় অনেকেই আপত্তি জানিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ প্রার্থী পরিবর্তন করা দরকার। কারণ উনাকে অনেক নেতাকর্মীই চেনেন না।
ফেনী জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন, পৌরসভায়, উপজেলায়ও প্রার্থিতা বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদের কথা জানা গেছে। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক ফাহিমা আবেদীন দি ইনসাইটাকে বলেন, “স্কুলের টিচার্সরুমে এখন অন্যতম আলোচনাার বিষয় রাজনীতি। সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও অনেক কথাবার্তা হয় আমাদের মধ্যে।” তিনি আরো বলেন, “সোনাগাজী উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াতের নিজস্ব লোকদের মধ্যে এক ধরণের বিভক্তির কথা শুনতে পাচ্ছি, যদিও সেটা তেমন একটা প্রকাশ্য নয়। খুব বেশি বিস্ফোরিত হয়নি।” তবে একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে জামায়াতের কাছে তার প্রত্যাশা, তারা যেনো যোগ্য লোককেই প্রার্থী করে। ফাহিমা আবেদীন বলেন, “একজন নারী হিসেবেও বলবো- নারীবান্ধব পরিবেশের জন্য কাজ করবে, জামায়াত যেনো এমন কাউকে প্রার্থী করে।” তিনি বলেন, “এই প্রত্যাশা শুধু জামায়াতের কাছে নয়, বিএনপির কাছেও। আমরা চাই ভালো এবং ভালোর মাঝে প্রতিযোগিতা হোক।”
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জেও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাপা অসন্তোষের কথা জানা গেছে। সেখানে সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো ইউনিয়নভিত্তিক জনশক্তির কাছ থেকে ভোট নেওয়া হয়। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় জামায়াতকর্মী অভিযোগ করেন, তাদেরকে কেবল একজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম লিখতে বলা হয়েছে। তাদের মতে, এ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হয়, কারণ জনশক্তিরা পরোক্ষভাবে স্থানীয় আমীরসহ পদধারীদের পক্ষে ভোট দেওয়ার ইঙ্গিত পান। জামায়াতে বর্তমানে সক্রিয় সাবেক এক শিবিরনেতা বলেন, অন্তত তিনজন প্রার্থীর নাম লেখার সুযোগ থাকলে বিকল্প প্রার্থীরাও সামনে আসতে পারতেন।
তৃণমূলের বিচ্ছিন্নতা
রাজশাহীর সিটি করপোশনে মেয়রপদে কাকে প্রার্থী করা হবে, এনিয়ে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বিধা বিভক্তির কারণে প্রার্থী ঘোষণাই স্থগিত করে রাখা হয়েছে। এছাড়া, রাজশাহী সিটির ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী করা হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার শাকিলুল রহমানকে, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে মিজানুর রহমান মিলন এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ পারভেজকে। দলীয় নেতাকর্মীদের বিতর্কের মুখে ৩টি ওয়ার্ডেই মনোনয়ন স্থগিত করেছে জামায়াত।
প্রায় ২০ বছর ধরে রাজশাহী শহরে রিক্সা চালান ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল বাতেন। তিনি রাজশাহী সিটির একজন ভোটার। জামায়াতের প্রার্থিতার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা দিনমজুর মানুষ। কোনো দল করি না। যে প্রার্থী ব্যক্তি হিসেবে ভালো, আমরা তাকেই ভোট দিব।
এদিকে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে মেয়ের পদে জামায়াতের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, ঢাকা উত্তর সিটিতে দলটির মহানগর আমির সেলিম উদ্দিন, গাজীপুর সিটিতে ড. হাফিজুর রহমান এবং চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীর নাম চূড়ান্ত করেছে দলটি। শামসুজ্জামান হেলালী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ষোলশহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সাদিক কায়েম, ড. হাফিজ এবং অন্যান্যদের নিয়ে তেমন কোনো বিভক্তির কথা শোনা না গেলেও সেলিম উদ্দিনকে প্রার্থী করা নিয়ে দলের তৃণমূলে রয়েছে হতাশা।
দি ইনসাইটার সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারাদেশের বেশিরভাগ এলাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের তৃণমূলে অন্তের্কোন্দল চলছে। কোথাও কোথাও এটি তীব্র আকার ধারণ করেছে। এসব বিষয়ে এহসান মাহবুব জুবায়ের বলেন, “একটা জনপ্রিয় দলে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। এটা অস্বীকার করছি না। তবুও আমরা চেষ্টা করি- যাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে, দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়, ক্লিন ইমেজ রয়েছে- এ ধরনের ব্যক্তিরা দলের যে পর্যায়ের নেতা বা কর্মীই হোক, তাদেরকে প্রার্থী করতে।” জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের এ সদস্য আরো জানান, “সিটি ও জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে কিছু নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে জরিপ করানো হয়, প্রার্থীদের জনিপ্রয়তা যাচাই করা হয়। কিন্তু, ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলায় কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ওসব জায়গায় স্থানীয় সংগঠনের মতামতকেই গুরুত্ব দেয়া হয়।”
জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের জন্য কি ধরণের চ্যালেঞ্জ থাকবে- এ বিষয়ে দি ইনসাইটার সঙ্গে কথা হয় নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলির সাথে। যিনি সদ্য সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব। দায়িত্ব পালন করেছেন অসংখ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রিটার্নি অফিসার হিসেবে। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি ভিন্ন। জাতীয় নির্বাচন এখন থেকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে, কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা বরাবরই ব্যতিক্রম। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব সময় দলীয় সরকারের অধীনেই হয়। জেসমিন টুলির মতে, এখন যেহেতু বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকে? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হয় কিনা? বিরোধীদল সমর্থিত প্রার্থীদের জন্য পরিবেশ কতটা অনুকূলে থাকবে? এটা বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- প্রার্থী নির্বাচন। নতুন আইন অনুযায়ী- সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো এখানে সরাসরি প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারবে না। তারা শুধু প্রার্থীকে সমর্থন দিবে। সুতরাং নির্বাচনটা দলকেন্দ্রীক না হয়ে প্রার্থীকেন্দ্রীক হবে। জামায়াত যাদেরকে সমর্থন দিবে, তারা নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতায় নির্বাচন করতে হবে। জেসমিন টুলি বলেন, দল হয়তো তার জন্য কাজ করবে। কিন্তু এখানে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতাই মুখ্য হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী এক ধরণের ‘সাংগঠনিক রক্ষণশীলতা’ বা ‘ইনব্রিডিং’ সমস্যায় ভুগছে। দলটির নীতি-নির্ধারকরা সাধারণ জনগণের চাহিদা ও প্রার্থীর ‘উইনেবিলিটি’ বা বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতা বিচার না করে কেবল দলীয় আনুগত্য ও পদবীকে প্রাধান্য দেয়। তাদের মতে- জামায়াতের উচিত, প্রার্থী করার ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ত ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেয়া। কেবল দলীয় বলয়ের ভেতরের লোক না খুঁজে পেশাজীবী ও জনপ্রিয় মুখদের সামনে আনা। এসব বিষয় উপেক্ষা করলে আর সমন্বয়হীনতা চলতে থাকলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত কেবল তাদের নিজস্ব ‘ভোট ব্যাংক’ রক্ষা করতে পারলেও সাধারণ ও ভাসমান ভোটারদের সমর্থন হারিয়ে বড় ধরণের পরাজয়ের সম্মুখীন হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু দি ইনসাইটাকে বলেন, দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় মতাদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল। অতএব তাদের মধ্যে ইনবিল্ট রক্ষণশীল মনোভাব কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক। জামায়াতের সদস্য হতে হলে একজন নাগরিককে ইসলামের মৌলিক নীতি ফরজ-ওয়াজিব সমূহ মেনে চলতে হয়, কবীরা গুনাহ অর্থাৎ (মৌলিক বা বড় ধরনের পাপকাজ) থেকে দুরে থাকতে হয়। এরপর বিবেচনায় আসে কে কত জনসম্পৃক্ত ও জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এগুলো অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক দলে এতো কঠোর নিয়ম নেই। তাদের কাছে জনপ্রিয়তা, জনসম্পৃক্ততা ও ব্যক্তিগত সামর্থ্যই অনেক বড়।
জামায়াতের রাজনীতিতে এক ধরণের ক্যাডারভিত্তিক চর্চা আছে। দলটি তাদের নেতাকর্মীকে ৩টি স্তরে ভাগ করে- সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন। সহযোগী সদস্য ও কর্মীরা দলটির সর্বোচ্চ ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা হতে পারেন। “রুকন” হচ্ছে জামায়াতের সর্বোচ্চ স্তর। ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রুকনরাই নেতৃত্বে আসতে পারেন।




