৫১ অনুচ্ছেদ কি বাঁচাতে পারবে চুপ্পুকে?
ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো বাধা নেই। তবে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে নেয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনি সুরক্ষা পাবেন।
স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার পর থেকেই সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করার জোর দাবি উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে এই দাবির মুখে সাংবিধানিক দায়মুক্তির অনুচ্ছেদ ৫১-এর দিকে আঙুল তুলেছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান তাকে আংশিক আইনি সুরক্ষা দিলেও সর্বাত্মক ঢাল হিসেবে কাজ করবে না। বিশেষ করে পদত্যাগের পর তার গ্রেপ্তারে আর কোনো সাংবিধানিক বাধা অবশিষ্ট নেই। এমনকি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর দায়মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যও সঠিক নয় বলে মত দিয়েছেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির দি ইনসাইটাকে বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তার দায়মুক্তির কোনো সুযোগ নেই। একই মত দিয়েছেন বিএনপিপন্থী আইনজীবী সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী।
Since the resignation letter was submitted to the Speaker, there has been a strong demand in the political arena for the arrest and trial of the recently-outgoing President Md. Shahabuddin Chuppu. However, in the face of this demand, the former President has pointed his finger at Article 51 of the Constitutional immunity. According to legal experts, even if the Constitution gives him partial legal protection, it will not act as a comprehensive shield; especially after his resignation, there is no constitutional barrier left to his arrest. Even Home Minister Salauddin Ahmed’s statement on the immunity of Shahabuddin Chuppu is not correct, the lawyers have opined. Two senior Supreme Court lawyers, including Jamaat leader Advocate Shishir Monir, told The Insight that there is no chance of his immunity after stepping down from the post of President. BNP-backed lawyer Barrister M Moin Alam Firozi, a former member of the Constitutional Reforms Commission, shared the same opinion.
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর থেকেই রাজপথে ও সংবাদ সম্মেলনে সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইনকিলাব মঞ্চ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়েও প্রশাসনকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই দাবির জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুসরণের পরামর্শ দেন। চুপ্পু দাবি করেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সংকট সামলেছেন। লন্ডন সফর বা চাপে পড়ে পদত্যাগের খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে তিনি জানান, শারীরিক অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন এবং আপাতত চিকিৎসা গ্রহণই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
এদিকে, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান পদত্যাগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দুর্নীতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
সংবিধানের চতুর্থ ভাগের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি নিয়ে দুইটি আলাদা দফা রয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে আইনি বিতর্ক তুঙ্গে: ৫১(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে করা বা না করা কোনো কাজের জন্য পদ ছাড়ার পরও আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। ৫১(২) অনুচ্ছেদ বলা আছে, পদে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা চালানো যাবে না এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির এই অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, ৫১(২) অনুচ্ছেদের সুরক্ষা কেবল ‘স্বীয় কার্যকালে’ অর্থাৎ পদে বহাল থাকা অবস্থায় প্রযোজ্য। পদত্যাগের পর সেই নিষেধাজ্ঞা আর কার্যকর থাকে না। অতীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদত্যাগের পর বিচার ও সাজা পাওয়ার নজির রয়েছে।
সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের পর তার ক্ষেত্রে আইনগত পরিস্থিতিকে মূলত তিনটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন আইনজ্ঞরা।
প্রথমত, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নেয়া সিদ্ধান্ত বা কাজের ক্ষেত্রে তিনি সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনি সুরক্ষা পাবেন। পদ ছাড়ার পরও এই দায়মুক্তি বহাল থাকে, ফলে বঙ্গভবনে আসীন থাকা অবস্থায় পদের দায়িত্ব হিসেবে তিনি যেসকল পদক্ষেপ নিয়েছেন বা মন্তব্য করেছেন, সেগুলোর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দাঁড় করানো কিংবা আইনি আইনি পদক্ষেপে সফল হওয়া অত্যন্ত কঠিন হবে।
দ্বিতীয়ত, ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদের যে সুরক্ষাকবচ ছিল, পদত্যাগের সাথে সাথেই তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কারণ এই অনুচ্ছেদের আইনি বাধাটি কেবল রাষ্ট্রপতির ‘স্বীয় কার্যকালে’ বা পদে থাকা অবস্থায় প্রযোজ্য ছিল। ফলে পদত্যাগের পর তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের কিংবা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আর কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বাধা নেই।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের যেকোনো কর্মকাণ্ড, দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত অপরাধ কিংবা দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কোনো সুরক্ষাই দেয় না। পদটি একজন ব্যক্তির পূর্বের বা ব্যক্তিগত জীবনের অপরাধ ঢাকতে পারে না। ফলে তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুদক কমিশনার কিংবা ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে যেসকল বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন, সেগুলো সম্পূর্ণরূপে বিচারযোগ্য এবং এর ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সম্পূর্ণ খোলা।
যে ৪টি মূল অভিযোগে বিচারে বাধা নেই
আইনজীবীরা স্পষ্ট বলছেন, বঙ্গভবনে বসার আগে সংঘটিত অপরাধ বা কোনো ব্যক্তিগত অপরাধের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কোনো সুরক্ষা বা ‘ছাতা’ হতে পারে না। সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রধানত যে ৪টি গুরুতর অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে, সেগুলোর কয়েকটি তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের ঘটনা।
১. ইসলামী ব্যাংক ও এস আলম সংশ্লিষ্টতা: ২০১৭ সাল থেকে ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান থাকার সময় ব্যাংকের অর্থ লোপাট ও কেলেঙ্কারির ঘটনায় ডিরেক্টর হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে।
২. পদ্মা সেতু দুর্নীতি তদন্ত বন্ধ: ২০১৪ সালে দুদক কমিশনার থাকাকালে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি অনুসন্ধান রহস্যজনকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার দায়ভার তাঁর ওপরও বর্তায়।
৩. দ্বৈত নাগরিকত্ব বিতর্ক: বার্বাডোজের নাগরিকত্ব গোপন রাখার অভিযোগে হাইকোর্টে রিট চলমান, যা তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৪. পদত্যাগপত্র নিয়ে স্ববিরোধিতা: শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে প্রথমে জাতির উদ্দেশ্যে এক কথা এবং পরবর্তীতে সাক্ষাৎকারে ভিন্ন তথ্য দিয়ে সাংবিধানিক সংকট তৈরি করা।
সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির দি ইনসাইটাকে বলেন, সংবিধানের ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা শুরু বা চালু রাখা যায় না। তবে মেয়াদ বা পদ শেষ হওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা বা বিচার করা যাবে না—সংবিধানে এমন কোনো সুযোগ নেই। অতীতে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল মামলা হয়েছিল এবং তিনি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেল খেটেছেন। ফলে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার করা সম্ভব নয় বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা আইনগতভাবে সঠিক নয়।
শিশির মনির বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের অর্থ লোপাট ও মানিলন্ডারিংয়ের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার পূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তিনি এস আলম গ্রুপের হয়ে ‘জেএমসি’ নামক একটি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের ডিরেক্টর এবং পরবর্তীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে ওই সময়ে সংঘটিত লোন ডিফলকেশন ও ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ডিরেক্টর হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কোনো আইনি বাধা নেই।
তিনি আরো বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে কিংবা ২০২৪ সালের ক্র্যাকডাউন ও গণহত্যার ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতির দায় নির্ধারণে তদন্ত প্রয়োজন। তৎকালীন সরকারের এসব কর্মকাণ্ড বা নির্দেশনার বিষয়ে সরকারপ্রধানের সাথে তাঁর কোনো ফোনালাপ, ইনস্ট্রাকশন বা আলাপ-আলোচনা হয়েছিল কিনা এবং তাতে রাষ্ট্রপতি সায় দিয়েছিলেন কিনা, তদন্তে তা প্রমাণিত হলে এসব ঘটনার দায়েও তাঁকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব।
সাবেক সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার এম মঈন আলম ফিরোজী দি ইনসাইটাকে বলেন, সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন তাঁর সরকারি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে গৃহীত সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি দায়মুক্ত থাকবেন। কারণ এগুলো রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পন্ন করা হয় এবং এর জন্য সরাসরি রাষ্ট্রকে দায়ী করা যায়, রাষ্ট্রপতিকে ব্যক্তি হিসেবে নয়। অন্যদিকে, ৫১(২) অনুচ্ছেদটি কিন্তু স্থায়ী দায়মুক্তি নয়। এটি মূলত একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ বা প্রসেসিয়াল সুরক্ষার মতো কাজ করে।
তিনি বলেন, সংবিধানে পরিষ্কারভাবে ফৌজদারি মামলা দায়ের, সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে—যা সবই আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে কোনো প্রকার অপরাধ থেকে মুক্তি বা ক্ষমা দেয়া হয়নি। তাই অপরাধমূলক কোনো কাজ ঘটলে সেটির অস্তিত্ব বা অপরাধের দায় বহাল থাকে, কিন্তু তা নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগটি রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালে সুপ্ত বা স্থগিত অবস্থায় থাকে।
ভুল ব্যাখ্যা দিয়েয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও
লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চপ্পু এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে কোনো ফোনালাপ হয়েছে—এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ সরকারের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ফোনালাপ সংক্রান্ত বিষয়টি তিনি সংবাদপত্রে দেখেছেন। তবে সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ নেই। তিনি মন্তব্য করেন, “ইন্টারনেটের এই যুগে কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইলে লন্ডনে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না, এখান থেকেই যোগাযোগ করা সম্ভব।”
সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের শেষভাগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সম্পূর্ণ সময় এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের আমলে তিনি সংবিধান ও বিধিবিধান মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকার সব সময় তাঁর পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছে। সাংবিধানিক সুরক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “সংবিধান অনুসারে তিনি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত (Privileged) এবং তাঁর দায়মুক্তি রয়েছে। তাই ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য কোনো বিষয়ে আদালতে সরাসরি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।”
কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যকেও যথাযথ মনে করছেন না আইননজ্ঞরা। ব্যারিস্টার মঈন এম ফিরোজী বলেন, রাষ্ট্রমন্ত্রী সংবিধানে রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধিকারের বিষয়ে একটি পুরোপুরি ব্যাকরণিক বা ভাষাগত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কিন্তু কোনো আইনি ব্যাখ্যা বা পর্যালোচনা করেননি। তিনি তাঁর বক্তব্যে পুরো আইনি বিষয়টি স্পষ্টভাবে না তুলে ধরে বিষয়টি অর্ধেক বা আংশিকভাবে পেশ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুসারে প্রিভিলেজড এবং তাঁর ‘ইনডেমনিটি’ (দায়মুক্তি) দেওয়া আছে বলে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা আইনি দিক থেকে সঠিক নয়। আইনজ্ঞের মতে, সংবিধানের অনুচ্ছেদে ‘ইনডেমনিটি’ শব্দটির কোনো অস্তিত্বই নেই এবং যদি কেউ একে ইনডেমনিটি বলে থাকেন, তবে তিনি ভুল বলছেন।
ছাত্রলীগকর্মী থেকে রাষ্ট্রপতি
১৯৪৯ সালে পাবনায় জন্ম নেয়া মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্ররাজনীতি থেকে। ছাত্রজীবনে তিনি পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে তিনি একই জেলার যুবলীগের সভাপতি মনোনীত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কারাভোগ করেন।
পরবর্তী জীবনে বিচার বিভাগে কর্মজীবন কাটালেও আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর দলীয় ঘনিষ্ঠতা ছিল অটুট। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, যা ছিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সমমর্যাদার। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ হাজার ৫৭১টি অভিযোগ স্থান পায়—যার মধ্যে ৩৫৫টি খুন এবং ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ গুরুতর অপরাধের ৩ হাজার ২৭০টি ঘটনা চিহ্নিত করা হয় এবং এসবের জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হয়।
এছাড়া মেখ মুজিব হত্যা মামলায় আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়কারী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। একইসাথে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডেস্ক অফিসার দায়িত্ব পালন করেন।
২০১১ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। কমিশন থেকে অবসরের পরের বছরই তিনি যুক্ত হন ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এবং ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। এই নিয়োগটি হয়েছিল এস আলম গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট চট্টগ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘জেএমসি বিল্ডার্স’-এর প্রতিনিধি হিসেবে। এরপর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একক মনোনয়নে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বঙ্গভবনের পরবর্তী অধ্যায়
হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিলে দায়িত্ব নেওয়া সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তাঁর নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষের দুই বছর আগেই পদত্যাগ করেন।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার সুবাদে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। তবে আইনি কাঠামোর জটিল হিসাব-নিকাশ শেষে দেখার বিষয় হলো—সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত পূর্বের অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের ও তদন্তের প্রক্রিয়ায় এগোয় কি না।



