বিশ্বকাপের উন্মাদনা কি বদলে গেল, নাকি বদলেছে তার ভাষা?
ছাদে পতাকা কম, গলিতে বড় পর্দার কমতি। তবু টিএসসিতে ভিড় ছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে তবে কি বিশ্বকাপের উন্মাদনা সত্যিই কমে গেল? নাকি ইমোজি আর রিলসে বদলে যাচ্ছে তার প্রকাশের ভাষা?
During the 2026 World Cup, Dhaka's rooftops flew fewer flags and its alleys lost their big screens . Yet the passion seems undimmed. It has perhaps migrated to emojis, reels, and digital stickers. Are fans then simply celebrating differently, or being quietly reshaped by the platforms designed to capture their attention?
১.
২০ জুলাই বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ত্রিওন্ডা ইমোজি আবার সাধারণ সাদা-কালো ফুটবলের ইমোজি হয়ে গেছে। পতাকার থিমও হয়তো আর নেই। ফুটবল সেন্ট্রাল-এর হাবও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এসবকিছু মিলেই ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস, উম্মাদনা ও সমর্থন প্রকাশের ধরন সম্পর্কে নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল। বিশ্বকাপের উন্মাদনা কি সত্যিই কমে যাচ্ছে, নাকি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে তার প্রকাশের ভাষা? ছাদের ওপর উড়তে থাকা পতাকা আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে জ্বলে ওঠা স্ক্রিনের থিম- দুটিই কি একই আবেগের ভিন্ন প্রকাশ? নাকি প্রযুক্তি আমাদের সমর্থন জানানোর নতুন পথও তৈরি করে দিয়েছে? এই পরিবর্তন কি এই তরুণ প্রজন্মের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্বের, নাকি তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে? নাকি তাদের উৎসবের ধরনও ধীরে ধীরে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ডিজাইন অনুসরণ করে বদলে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর যর্থাথ উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া সম্ভব নয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট- ২০২৬ সালের এই ফুটবল বিশ্বকাপে শুধু খেলার ধরনই পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয়েছে পছন্দের দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশের ভাষা, সমর্থকদের খেলার অংশ হয়ে ওঠার প্রবণতা এবং খেলা দেখার সংস্কৃতিতে। আপাতত সেই পরিবর্তনগুলোকে বোঝা ও শনাক্ত করার চেষ্টা করাই হয়তো এখন সবচেয়ে জরুরি।
২.
শুরুটা করি সেই রাতের গল্প দিয়ে। অফিস শেষে ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে ১০টা মতোই বেজে যায়। গত ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালীন এই ফেরাটা বেশ ঝক্কির-ই হতো। প্রতিটা গলিতে ছিল বড় পর্দার টেলিভিশন, আর তার সামনে মানুষের ভিড়! প্রায় সময়ই সিএনজি সেই ভিড় ঠেলে এগোতে পারতো না। কিন্তু এই চিরচেনা দৃশ্যটা এবারের বিশ্বকাপে চোখে পড়েনি বললেই চলে! ব্রাজিল বনাম জাপানের খেলায় শুধু নিজ বাসার গলিতে একবার দেখেছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে আর চোখে পড়েনি। সত্যিই বলতে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে। এজন্যই এরপর থেকে একটু সচেতনভাবেই পরিবর্তনগুলো খেয়াল করার চেষ্টা করেছিলাম। দেখলাম, এবারে ছাদে বা গলিতে পতাকাও কম ছিল, পতাকার ফেরিওয়ালাদেরকেও আগের তুলনায় কমই দেখ গেছে। অবশ্য জার্সি পরা সমর্থক দেখা গেলেও সেটিও আগের তুলনায় কিছুটা কম বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ ঘিরে টিএসসি, কিংবা বিভিন্ন ক্যাফেতে এখনও সমর্থকদের ভিড় দেখা গেছে। এর অর্থ উচ্ছ্বাস আছে, উত্তেজনাও আছে। তাহলে কি বিশ্বকাপের এই উম্মাদনা প্রকাশের ধরন বদলে গিয়েছে?
এই বদলে যাওয়ার প্রশ্নটা আসার পেছনেও কারণ আছে। এই প্রবণতাগুলো যখন লক্ষ্য করছিলাম, তখন মহল্লার কয়েকজনকে প্রশ্ন করেছিলাম, এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজনা কম, তাই না? বেশ কয়েকজন থেকে যেমনটা উত্তর পেয়েছিলাম, সেটার মোট সারমর্ম দাঁড়ালো, তারা প্রত্যেকেই কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কেউ চ্যাটে পতাকার স্টিকার পাঠাচ্ছেন, আবার তাদের এখন ইমোজি একটাই- ত্রিওন্ডা বল, কেউ রিলসে গোলের হাইলাইট দেখছেন, কেউ নিজে রিলস তৈরি করছেন প্রভৃতি প্রভৃতি। অর্থাৎ অনেক বন্ধু, আত্মীয়- স্বজনদের সঙ্গে উদযাপনের চেয়ে এখন হাতের মোবাইলেই বিশ্বকাপের উম্মাদনা নজরে আসছে যেন!
আমার এই শঙ্কাকে একটু মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। বর্তমান প্রজন্মের মনোজগতের বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বেশ কিছু ফিচার বাজারে এনেছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে মেটা, ফিফা, ইউটিউব, হোয়াটস্অ্যাপ এবং অ্যাডিডাস-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দর্শকের উত্তেজনাকে ক্রমেই মোবাইলকেন্দ্রিক করে তুলছে। হোয়াটস্অ্যাপ লাইভ ম্যাচ আপডেট, জাতীয় দলের চ্যানেল ও ফুটবল কমিউনিটিকে এক জায়গায় পাওয়ার জন্য চালু করেছে ‘ফুটবল সেন্ট্রাল ২০২৬’। এছাড়াও চালু করেছে অ্যানিমেটেড ত্রিওন্ডা ফুটবল ইমোজি, স্টিকার ও অন্যান্য ইন্টারঅ্যাকটিভ ফিচার। অন্যদিকে ফিফা, ইউটিউবের সঙ্গে চুক্তি করার মাধ্যমে মাধ্যমে হাইলাইটস, শর্ট ভিডিও এবং ক্রিয়েটরনির্ভর কনটেন্টে জোর দিয়েছে। আবার মেটা, ইউটিউব, হোয়াটঅ্যাপ-ই শুধু নয়, এগুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে টিকটকও। ফিফার সাথে চুক্তি করে টিকটক ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ হাব’ চালু করেছিল। এখানে ছিল ম্যাচের হাইলাটস্, কাস্টমাইজড করা স্টিকার প্রভৃতি। কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য আলাদা ফিচারও ছিল। ‘ক্রিয়েটর কোলাবোরেশন প্রোগ্রাম’- এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত কনটেন্ট নির্মাতা ফিফার আর্কাইভের ফুটেজ ব্যবহার করে নতুন কনটেন্ট তৈরি করতে পারতেন, কিংবা আড়ালের বিশেষ মুহূর্তগুলোও দেখাতে পারতেন।
অর্থাৎ বিশ্বকাপ এখন শুধু টেলিভিশনে দেখা একটা টুর্নামেন্ট-ই নয়। কারণ এখন দর্শক শুধু খেলা দেখেন না, বরং নিজেও সেটার সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠেন। দর্শক হয়তো ভাবছেন তিনি শুধু একটি ইমোজি পাঠাচ্ছেন, প্রিয় দলের পতাকা দিয়ে প্রোফাইল সাজাচ্ছেন বা একটি রিল শেয়ার করছেন, কিংবা কোনো রিলস তৈরি করছেন। কিন্তু আসলে একই সঙ্গে তিনি এক ধরনের ডিজিটাল কাঠামোর অংশ হয়ে উঠছেন। আর এখানে বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাসকে, উম্মাদনাকে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অংশগ্রহণে রূপ দেওয়ার জন্যই বড় প্রাযুক্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এতো এতো আয়োজন।
৩.
প্রাযুক্তিক কোম্পানিগুলো শুধু বিশ্বকাপকেন্দ্রিক ফিচারই অ্যাড করেননি, বরং এর মধ্যে দিয়ে তারা নতুন প্রজন্মের মনোজগতটাকেও ধরতে চেয়েছে। কসোভোর ইউনিভার্সিটি ফর বিজনেস এন্ড টেকনোলজি-এর ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ফ্যাকাল্টির গবেষক ট্রেন্ডেলিন হালিটি-সিলাজ এবং আলিসা সাদিকু যৌথভাবে তরুণদের মনোযোগের মেয়াদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায়, যারা বেশি রিলস দেখেন তাদের দীর্ঘ সময় একটানা মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাহলে রিলস, শর্টস ও দ্রুতগতির কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা এই প্রজন্মের কাছে ৯০ মিনিটের একটা খেলা দেখার অভিজ্ঞতাও কি বদলে যাচ্ছে? এর উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া যায় না। তবে একটা পরিবর্তন যে হচ্ছে- সেটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এটা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, নতুন প্রজন্ম এখন আর শুধু দর্শক হয়েই থাকতে চায় না। তারাও সেই খেলারই একটা অংশ হতে চায়। প্রিয় দলের জার্সি পরা, একটি ইমোজি পাঠানো, রিল বানানো বা ম্যাচের মুহূর্ত শেয়ার করা- এসবের মধ্য দিয়েও তারা নিজেদের সমর্থন প্রকাশ করছে। আবেগ হয়তো একই আছে, কিন্তু সেই আবেগ প্রকাশের ধরণ, মাধ্যম কিংবা উপায়গুলো ক্রমশই ডিজিটাল হয়ে উঠছে যেন!
আরেকটা বিষয়ও আছে। পরিবর্তনের পেছনে ফুটবল দেখার সহজলভ্যতারও একটা ভূমিকা থাকতে পারে। আগে বিশ্বকাপ ছিল আন্তর্জাতিক তারকাদের দেখার সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। এখন স্যাটেলাইট টেলিভিশন, স্ট্রিমিং মিডিয়া এবং সামাজিক মিডিয়ার কারণে দর্শক সারা বছরই ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ফলে বিশ্বকাপের প্রতি আগ্রহ কমেছে- বিষয়টা ঠিক এমন নয়। বরং এমন হতে পারে যে, টুর্নামেন্টটির বিশেষ উপলক্ষ হিসেবে যে স্বাতন্ত্র্যতা ছিল, সেটি অতীতের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে হয়তো।
সেই গলিটায় এখন হয়তো সিএনজি নির্বিঘ্নেই এগিয়ে যায়। বড় পর্দা নেই, ভিড়ও নেই। তবু প্রতিটি হাতের স্ক্রিনে হয়তো তখনও জ্বলছিল প্রিয় দলের রঙ। পতাকা নেমে এসেছে ছাদ থেকে, উঠে গেছে আঙুলের ডগায়। উন্মাদনা কি সত্যিই ফুরিয়েছে, নাকি বদলেছে শুধু তার পরিসর?
লেখক পরিচিত:
বর্তমানে কর্মরত আছেন জাতীয় দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক হিসেবে। স্নাতকোত্তর ও স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। তার আগ্রহের জায়গা হলো জেনারেশন-মিডিয়া রিলেশনশিপ, মিডিয়া-স্পোর্টস আন্তঃসম্পর্ক, সামাজিক মিডিয়া এবং সংবাদ কনসেপ্ট নিয়ে। লেখকের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ইমেইল করুন এই ঠিকানায়: jannatulruhi@gmail.com
Disclaimer: The views expressed in this article are the author's own and do not necessarily reflect The Insighta's editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.



