ক্যাম্পাসে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি: জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা কি ভূলুণ্ঠিত?
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং কোথাও কোথাও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবর উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে। প্রশ্ন উঠছে: আমরা কি আবার পুরোনো দলীয় ছাত্ররাজনীতির চক্রে ফিরে যাচ্ছি?
Recent clashes among student wings of political parties in Bangladeshi universities raise a big question: do our campuses are reverting to partisan politics, contrary to the spirit of the July Movement? It calls on the government, universities, political parties, and students to uphold the July's vision of inclusive, violence-free, and academically focused campuses.
গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং কোথাও কোথাও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর উদ্বেগজনকভাবে সামনে আসছে। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার, প্রভাব প্রতিষ্ঠা কিংবা সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব, যে কারণেই এসব সংঘর্ষ হোক না কেন, একটি মৌলিক প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে: আমরা কি আবার সেই পুরোনো দলীয় ছাত্ররাজনীতির চক্রেই ফিরে যাচ্ছি?
মাত্র দুই বছর আগেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীরা যে ঐতিহাসিক নয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল—ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা এবং তার পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক ছাত্র সংসদ চালু। এই দাবি কোনো তাৎক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং কয়েক দশকের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে জুলাই অভ্যূত্থানে নেতৃত্বদানকারী দল এনসিপিই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজেদের ছাত্রসংগঠন “ছাত্রশক্তি” গড়ে তোলে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস সুদীর্ঘ। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দল তাদের ছাত্রসংগঠনকে ক্যাম্পাসে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী নেতৃত্বের সুযোগ পেয়েছিল সত্য। তবে শিক্ষার্থীদের এমন লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির পরিণাম ছিল অনেক বেশি নেতিবাচক। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোকে বরং দেখা গেছে সহিংসতা, হল দখল, টেন্ডারবাজি, সিট বাণিজ্য, ভিন্নমত দমনে সক্রিয় থাকতে। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য সাধারণ শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে তারা। অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির শিকার হয়েছে। আবার অনেকেই ক্যাম্পাসে নিজের মত প্রকাশ করতেও ভয় পেয়েছে।
জুলাইয়ের আন্দোলন সেই পুরোনো বাস্তবতার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রত্যাখ্যান ছিল। তখন শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ঘাঁটি নয়। ক্যাম্পাসের নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের মাধ্যমে, বাইরের রাজনৈতিক দলের নির্দেশে নয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, সেই দাবি ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে দলগুলো। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও দলীয় পরিচয়ে সংগঠন গড়ে তোলা, নতুন সদস্য সংগ্রহ, প্রভাব বিস্তার, হল দখল এবং পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান। সংঘর্ষের খবরগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এগুলো একটি আদর্শিক বিচ্যুতিরও ইঙ্গিত দেয়।
অনেকে যুক্তি দেন, গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্রদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করার অধিকার রয়েছে। এই যুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যে কোনো রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করতে পারেন, রাজনৈতিক আলোচনা করতে পারেন, মত প্রকাশ করতে পারেন এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চর্চা আর রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অঙ্গসংগঠন হিসেবে ক্যাম্পাস পরিচালনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সমস্যার জন্ম হয় তখনই, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, আবাসিক হল কিংবা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে পড়ে।
বিশ্বের অনেক উন্নত গণতন্ত্রে শিক্ষার্থীরা রাজনীতি করে, কিন্তু অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত ছাত্রসংগঠনের পরিবর্তে থাকে স্বাধীন ছাত্র ইউনিয়ন বা স্টুডেন্ট গভর্নমেন্ট। এসব সংগঠন শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, একাডেমিক পরিবেশ, মানসিক স্বাস্থ্য, আবাসন, পরিবহন কিংবা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে কাজ করে। তারা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে অবস্থান নিতে পারে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শাখা হিসেবে পরিচালিত হয় না। ফলে মতের ভিন্নতা থাকলেও সহিংসতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
বাংলাদেশেও এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব নয়। বরং জুলাইয়ের নয় দফা সেই পথই দেখিয়েছিল। একটি কার্যকর, নির্বাচিত এবং জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদ থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন হবে ভোটের মাধ্যমে, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার বৈধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগও বজায় থাকবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও সেগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের প্যানেল দিয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যই নেতৃত্বের প্রধান যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি সত্যিই ক্যাম্পাসে সহিংসতা কমাতে হয়, তাহলে শুধু সংঘর্ষের পর দোষী খুঁজে শাস্তি দিলেই হবে না; প্রতিনিধিত্বের এই কাঠামোগত সংকটও সমাধান করতে হবে।
এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সুবিধা বা বৈষম্যের শিকার না হন। আবাসিক হল, ক্লাসরুম, গ্রন্থাগার কিংবা সাংস্কৃতিক পরিসর; সব জায়গায় সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। যদি তারা সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠার স্বাধীন পরিসর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তরুণদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন, কিন্তু সেই শিক্ষা কখনোই সহিংসতা, দখলদারিত্ব বা প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার সংস্কৃতির মাধ্যমে হতে পারে না।
জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু সরকার পরিবর্তনের দাবি ছিল না; এটি ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও আহ্বান। সেই আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একসঙ্গে দাঁড়ানোর মানসিকতা। যদি আজ আবার ক্যাম্পাসগুলো দলীয় সংঘর্ষের মাঠে পরিণত হয়, তবে সেই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হারিয়ে যাবে।
আজ তাই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে—আমরা কি জুলাইয়ের নয় দফাকে শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করব, নাকি তার বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নেব? ক্যাম্পাস কি আবারও দলীয় শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হবে, নাকি জ্ঞান, যুক্তি, বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের নিরাপদ পরিসর হয়ে উঠবে?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপর। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের পতাকায় নয়; তার শক্তি নিহিত থাকে স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত বিতর্ক, নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে। জুলাইয়ের নয় দফা সেই স্বপ্নই দেখিয়েছিল। এখন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল এবং সর্বোপরি শিক্ষার্থীদেরই।
About the author:
Zahed Arman is an Associate Editor for Politics and Governance at The Insighta. He is also an Assistant Professor of Political Communication at Mississippi State University. His research focuses on political campaigns, voter behavior, and social media analytics. He can be reached at za231@msstate.edu
Disclaimer: The views expressed in this article are the authors' own and do not necessarily reflect The Insighta's editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.



