'জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ' স্লোগানে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার, ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে ২৬টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত মানবিক রাষ্ট্র গড়ার রূপরেখা তুলে ধরেছে দলটি।
With elections ahead, Jamaat-e-Islami has unveiled its manifesto outlining 26 priority areas. From jobs for youth and women’s workplace safety to education, healthcare reform, and anti-corruption measures, the plan promises a more inclusive, accountable, and people-focused approach to governing Bangladesh.
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি হোটেলে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান ৯০ পৃষ্ঠার এই ইশতেহার তুলে ধরেন। ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার নির্বাচনী ইশতেহার’। এতে আগামী পাঁচ বছরে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ২৬টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি।
ইশতেহার তৈরির পেছনের কথা
জামায়াত জানিয়েছে, সারাদেশের কয়েক লাখ মানুষের মতামত, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে এই ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। দলটির লক্ষ্য হলো একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়া।
যুবক ও কর্মসংস্থান
ইশতেহারে বেকারত্ব দূর করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়েছে। জামায়াত বলেছে, দেশে প্রায় সাত কোটি কর্মক্ষম যুবক রয়েছে। তাদের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে। এজন্য আধুনিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদেশে যেতে আগ্রহী যুবকদের কম খরচে পাঠাতে আন্তঃসরকার চুক্তি করা হবে। ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার কথাও ইশতেহারে আছে। সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল করা হবে এবং নিয়োগ হবে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে।
নারীর কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তা
নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর বিষয়টি নিয়ে আগে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। ইশতেহারে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জামায়াত বলেছে, মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়ের সম্মতিতে দৈনিক কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হবে, যাতে নারীদের চাকরি ছাড়তে না হয়। নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ব্যস্ত সময়ে নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস, গণপরিবহনে সিসিটিভি, ডাবল ডেকার বাসে নারীদের আলাদা কামরা, জরুরি হেল্পলাইন এবং জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার
ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষমতায় গেলে শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। শিক্ষা বাজেট জিডিপির ৬ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, বিনা সুদে শিক্ষা ঋণ এবং নারীদের স্নাতক পর্যন্ত বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বৈষম্য দূর করে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাকে সরকারি করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব
জামায়াতের ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। পাঁচ বছরের নিচে শিশু ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতের বাজেট ধাপে ধাপে তিন গুণ বাড়ানো হবে। প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ ও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত বলেছে, দেশের কোনো জেলা চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবে না।
২৬টি অগ্রাধিকার বিষয়
জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ইশতেহারে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে-
১. ’জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন;
২. বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন;
৩. যুবকদের ক্ষমতায়ণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া;
৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন;
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ;
৬. সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন;
৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন;
৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ;
৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক যাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ;
১০. সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা;
১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা;
১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা;
১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা;
১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন (পরিবেশগত শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ ও বাংলাদেশ গড়া;
১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি;
১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ, সৃষ্টি করা;
১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;
১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সকলের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা;
১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা;
২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা;
২১. দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বেধে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা;
২২. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও চাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা;
২৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা;
২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা;
২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
লক্ষ্য কী
জামায়াত বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সততা, ঐক্য, ইনসাফ ও দক্ষতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবে। দলটির লক্ষ্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া, যেখানে সবাই সমান সুযোগ পাবে এবং কেউ পিছিয়ে থাকবে না।
এই ইশতেহারের মাধ্যমে জামায়াত ইসলামী জনগণের সামনে তাদের পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরেছে। এখন সিদ্ধান্ত জনগণের, কে তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে।
Disclaimer: The views expressed in this article are the author’s own and do not necessarily reflect The Insighta’s editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.





