পোশাকের বাইনারি নিয়ে বিব্রত সালমা আর জ্যোতি
জুলাই'র আইকনিক ছবির দুই মুখ সালমা ও জ্যোতি 'বোরকা বনাম টি-শার্ট' বাইনারিতে বন্দি হতে নারাজ। তাঁদের কাছে সেদিন পোশাক নয়, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দুই সাধারণ শিক্ষার্থীর অভিন্ন প্রতিরোধই ছিল একমাত্র সত্য।
Salma and Jyoti are uneasy. They did not take to the streets that day to tally who is conservative and who is liberal, or to make a fashion statement. As ordinary students, their spontaneous resistance to discrimination has instead been trapped in a frame of clothing, even glorified through it, and that deeply embarrasses them. The way ordinary people, the media, and society have read this photograph as nothing more than a 'burqa vs. T-shirt,' a 'binary of clothes,' a union of two opposing poles, both women pictured in it strongly object to and resent.
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে করলেই একটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছবিটা ১৬ জুলাইয়ের। ধুলোবালি মাখা পিচঢালা পথ, পেছনের লাল ইটের চেনা দালান। আর তার সামনে দিয়ে লাঠি হাতে হেঁটে আসছেন দুই তরুণী। একজন সর্বাঙ্গে কালো আবায়া ও নেকাব জড়ানো। অন্যজন টি-শার্ট আর জিন্সে সাবলীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতি- সবখানেই এই ছবিটিকে ব্যবহার করা হয়েছে বৈচিত্র্য আর ঐক্যের এক পরম প্রতীক হিসেবে। চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থা একে চিত্রায়িত করেছিল ‘পোশাকের বাইনারি’ বা দুই মেরুর মেলবন্ধন হিসেবে। কিন্তু সেই ফ্রেমের পেছনে থাকা আসল মানুষ দুটির মনের কথা ভিন্ন।
‘দি ইনসাইটার’-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল এই আইকনিক ছবির মূল দুই চরিত্রের সাথে। একজন বোরকা পরিহিত সালমা আক্তার লিপি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। আন্দোলেনর সময় ছিলেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যজন টি-শার্ট পরা শ্রাবণী জামান জ্যোতি। ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তিনিও আন্দোলেনর সময় ছিলেন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের সেই মুহূর্ত এবং ছবিটির পেছনের গল্প জানা। কিন্তু প্রথাগত ধারার কোনো সাক্ষাৎকার দিতে তারা স্পষ্টই রাজি হননি। বিশেষ করে, গণমাধ্যম বা সমাজ যেভাবে এই ছবিটিকে কেবল ‘পোশাকের মেলবন্ধন’ হিসেবে দেখেছে, তা নিয়ে কথা বলতে তাদের দুজনেরই রয়েছে তীব্র আপত্তি।
দি ইনাসাইটার সাথে কথা বলার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন সালমা। তিনি জানান, গত বছরের জুলাই মাসেও অসংখ্য মানুষ ও গণমাধ্যম কর্মী তাঁর সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরিবার থেকে সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয়নি। আর এর পেছনে একটি বড় কারণ ছিল মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি বলেন বলেন, “সবাই আসলে পোশাক নিয়েই কথা বলতে চায়। কিন্তু আমরা তো পোশাকের বাইনারি বা কে কী পরল, সেই হিসাব মেলাতে আন্দোলনে নামিনি। রাজপথে যখন নেমেছিলাম, তখন এত কিছু হিসাব করে আমরা দু’জন দুপাশ থেকে হেঁটে যাইনি। ওটা ছিল নিতান্তই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের এক সম্মিলিত লড়াই। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সাধারণ সেই মুহূর্তটিকে যেভাবে পোশাকের বাইনারিতে আটকে ফেলা হয়েছে, তা আমাকে ভীষণভাবে বিব্রত করে।”
একই মন্তব্য করেছেন জ্যোতিও। জিন্স আর টি-শার্ট পরা যে মেয়েটির মুখের দৃঢ় অভিব্যক্তি কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল- সেই জ্যোতি জানালেন, যে কোনো পূর্বপরিকল্পনা থেকে এই দৃশ্যের জন্ম হয়নি।
জ্যোতি বলেন, “এই ছবিটি যে কখনো এভাবে আইকনিক হয়ে উঠবে, আমরা সেটা ভাবতেও পারিনি। পরে দেখি, অনেকেই এটাকে জুলাই আন্দোলনের একটি প্রতীক হিসেবে দেখছেন এবং অনেক মানুষ বলেছেন, ছবিটা তাদের অনুপ্রাণিত করেছে। যেটা অবশ্যই ভালো লাগার বিষয়। তবে একই সঙ্গে আমি দেখেছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এই ছবিটিকে ব্যবহার করেছে। বাস্তবতা হলো, সেদিন আমরা কেউই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা পোশাকের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে যাইনি। আমরা আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী হিসেবে গিয়েছিলাম। সেদিন আমি যা পরা ছিলাম, সেটাই পরে মিছিলে বের হয়েছিলাম। তখন পোশাক নিয়ে আলাদা করে ভাবার মতো পরিস্থিতিই ছিল না। তাই পরে যখন দেখলাম আমাদের পোশাককে কেন্দ্র করে ‘বোরখা বনাম টি-শার্ট’ ধরনের একটি বাইনারি তৈরি করা হচ্ছে, সেটা আমার কাছে বেশ বিব্রতকর লেগেছে। এমনকি এই ছবির কারণে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ট্রোলিং, গালাগাল ও স্লাট-শেমিংয়েরও শিকার হতে হয়েছে। দুইটা ভিন্ন মানুষ একই লক্ষ্য ও ন্যায়সঙ্গত দাবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল। পোশাক আমাদের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু আন্দোলনে আমাদের অবস্থান, সাহস এবং উদ্দেশ্যই ছিল আসল বিষয়।
ক্যামেরার লেন্স তাদের পোশাকের বৈপরীত্যকে ফ্রেমবন্দি করেছে, কিন্তু সালমা আর জ্যোতির কাছে সেই মুহূর্তটির সত্যতা ছিল কেবলই অধিকার আদায়ের এক অভিন্ন জেদ। সালমা ও জ্যোতি চিরচিারিত গণমাধ্যমের বয়ান আর সামাজিক ধারণার মুখে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন, যখন একটি ছবি দেখে নিজেদের মতো করে তার অর্থ বানিয়ে ফেলা হয়, তখন মূল লড়াইয়ের মাহাত্ম্য ধামাচাপা পড়ে যায়। তারা বলছেন, সেদিন তারা কোনো ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বা সামাজিক ট্যাবু ভাঙার পরীক্ষা দিতে রাজপথে নামেননি। তাদের হাতের লাঠি কিংবা মুখের অবয়ব কোনো কৃত্রিম সমীকরণ ছিল না। সেটা ছিল স্বৈরাচার আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে দুই সাধারণ শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ।
ঘরকুনো সালমা যেভাবে হযে উঠেন অভ্যুত্থানের আইকনিক চরিত্র
সালমা আক্তার লিপি আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই এক রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়া শান্ত স্বভাবের মানুষ। তার প্রতিদিনের চেনা জগৎটা ছিল ভীষণ ছকবাঁধা। ডিপার্টমেন্ট থেকে হল, আর হল থেকে ডিপার্টমেন্ট। ঘরকুনো স্বভাবের সালমা কখনো ভাবেননি রাজপথের কোনো উত্তাল আন্দোলন তাকে এভাবে ছুঁয়ে যাবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, প্রথম দিকে তিনি স্রেফ একদিনের জন্য রাজপথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে বসেছিলেন। এরপর আবার ফিরে যান নিজের চেনা শান্ত জীবনে। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে শুরু করে ১৫ই জুলাইয়ের সেই ভয়াল রাতে।
সেই রাতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর যখন হামলা চালানো হয়, তখন সালমা ছিলেন হলের বারান্দায়। দূর থেকে ভেসে আসছিল সহপাঠী আর বোনদের বাঁচানোর আকুল আর্তনাদ। সালমা জানান, হলের আপুরা যখন সবাইকে বাইরে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানালেন, তখন আমার ভেতরের চেনা দ্বিধা-দ্বন্দ্বগুলো নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। রক্ষণশীল পরিবারের কড়া নিয়ম আর হুট করে রাজপথে চলে যাওয়ার ভয়কে জয় করে এক অদ্ভুত নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে আমি পা বাড়ালাম বাইরের অন্ধকারে। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সালমা আরো বলেন, “ওদের বাঁচানোর আকুতি আমাদের হল অব্দি শোনা যাচ্ছিল। ওটা শুনে হুট করে আমার মনে হলো—আমিও যাই। ওরাও তো আমার মতোই সাধারণ শিক্ষার্থী।”
সালামা বলেন, চৌরঙ্গী মোড়ে পুলিশের অতর্কিত ধাওয়ায় দিশেহারা হয়ে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কোয়ার্টারে। ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে বাইরে পুলিশের গতিবিধির ওপর নজর রাখা আর তীব্র মাইগ্রেনের যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে কেটে যায় এক ভয়ার্ত রাত। সকালে কোনোমতে হলে ফিরে আসলেও আমার চোখে আর ঘুম ছিল না। ১৬ই জুলাই সকালে যখন খবর আসে মেয়েরা আবারও হল থেকে বের হয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, তখন আমি ঘরে বসে থাকতে পারিনি।
নিজের চেনা ভয়গুলোকে সালমা ততক্ষণে পুরোপুরি জয় করে নিয়েছেন। নিজের হাতে গাছের ডাল কেটে তৈরি করলেন আত্মরক্ষার লাঠি, বন্ধুদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন তা। সবাইকে লাঠি বিলি করে দেয়ার পর দেখলেন নিজের জন্য কোনো লাঠি নাই। পরে ঘরের মেঝে মোছার মপ-এর লাঠি নিয়েই নেমে পড়লেন রাজপথে। বাড়ি থেকে বারবার ফোন আসলেও মিথ্যা বলতে হয়েছিল যে তিনি হলের ভেতরেই নিরাপদে আছেন। সালমা বলেন, “আমি যখন বোরকা পরে অন্য হলের মেয়েদের ডাকতে গেলাম, তখন আমার বন্ধুরা ভাবলো- ও যদি বোরকা পরে আসতে পারে, আমরা কেন পারবো না? এই নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমি সেদিন রাজপথে নেমেছিলাম।”
পরবর্তীতে সালমা এবং তার জিন্স-টি-শার্ট পরা এক বন্ধুর আন্দোলনের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জুলাই আন্দোলনের অন্যতম এক আইকনিক ছবি হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু এই পরিচিতি সালমার জন্য কোনো সহজ অভিজ্ঞতা ছিল না। একদল মানুষ এই ছবিটিকে পোশাকের বাইনারি হিসেবে দাঁড় করিয়ে সমাজকে বিভক্ত করার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে সালমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অনেকে এই ছবিটা দিয়ে একটা বিভাজন তৈরি করতে চায়। কিন্তু আন্দোলনের সময় আমরা কেউ ভাবিইনি কে কনজারভেটিভ আর কে লিবারেল। সেখানে ক্রেডিট ছিল সবার। এক্সট্রা করে আমাকে গ্লোরিফাই করতে গিয়ে আমার ড্রেসকে গ্লোরিফাই করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।”
সালমা জানান, এই ছবিটির কারণে তাকে ও তার সহপাঠী বন্ধুকে অনলাইনে তীব্র বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। এমনকি তাকে বানোয়াটভাবে রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবেও প্রচার করার অপচেষ্টা চলে। সালমা সরাসরি বলেন, “আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই, আমি একজন সাধারণ শিক্ষার্থী।”
আজ জুলাই পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে সালমা আর দশটা মানুষের মতোই এক বুক হতাশা অনুভব করেন। দীর্ঘদিনের শোষণ আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেই প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে আজ বড় ব্যবধান।
সালমা বলেন, “জুলাই পরবর্তী সময়ে আমার মনে হয় না কেউ স্যাটিসফাইড। এমনকি আমিও স্যাটিসফাইড নই। শুধু সরকারের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বা কাঠামোর কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবুও এক সাধারণ ঘরের মেয়ে হিসেবে দেশের জন্য, বন্ধুদের জন্য সেদিন যে নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি লাঠি হাতে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সততা ও স্পিরিট আজও আমার অস্তিত্বে আছে।
লড়াইটা শেষ হয়নি, কাজ এখনো অনেক বাকি: জ্যোতি
পোশাকের তথাকথিত ‘বাইনারি’ বা বিভাজনের মধ্যে জ্যোতি নিজেকে কখনোই সীমাবদ্ধ রাখতে বা দাঁড় করাতে চাননি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক সমাজ ও মানুষ তাকে জোর করে সেই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় তাঁদের যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল, সেটি নিয়ে সাধারণ মহলে যেভাবে আলোচনা হয়েছে বা যে ন্যারেটিভে জিনিসটাকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আমাদের মূল উদ্দেশ্য মোটেও তেমনটি ছিল না। আমরা মূলত যে যেভাবে ছিলাম, ঠিক সেভাবেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে বেরিয়ে এসেছিলাম। এই ভুল ন্যারেটিভ ও পোশাকের চিন্তা নিয়ে জ্যোতি আগেও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার অভিযোগ- কেউ কখনো বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সেভাবে গায়ে লাগায়নি।
জ্যোতি বলেন, ১৬ জুলাই ২০২৪, এই দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম এক বিস্ময়কর আর মোড় ঘুরিয়ে দেয়া দিন। তার আগের রাতটা, অর্থাৎ ১৫ জুলাইয়ের অন্ধকার কেটেছিল চরম আতঙ্ক আর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আমরা বসেছিলাম শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের ওপর ধেয়ে আসে নির্মম হামলা। সেই রাতের ক্ষত আর আতঙ্ক বুকে নিয়ে পরদিন সকালে যখন চোখ মেললাম, সবার মনে একটাই প্রশ্ন—আজ কী হবে? এক বুক অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কা নিয়েও আমরা দমে যাইনি। ১৬ জুলাই আরও বড় পরিসরে আন্দোলনের ডাক দেয়া হলো। আর তখনই আমি সাক্ষী হলাম এক অভূতপূর্ব, অবিস্মরণীয় দৃশ্যের। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছিল, সেই প্রচণ্ড রোদকে উপেক্ষা করে দলে দলে মানুষ ছুটে আসতে লাগলেন। শুধু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, সাভারের আশেপাশের স্কুল-কলেজের ছোট ছোট ভাই-বোন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মেলালেন। হাজার হাজার মানুষের সেই বাঁধভাঙা জোয়ার আমাদের বুকে এক লহমায় এনে দিল অসীম সাহস।
জ্যোতি বলেন, আমি ফজিলাতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থী। সকাল থেকেই আমরা হলের ভেতরে হ্যান্ড মাইক হাতে নেমে পড়লাম, ডাকতে লাগলাম অন্য বোনদের। সকাল তখন প্রায় ১০টা। আমি যখন হল থেকে বের হলাম, ঠিক তখনই দেখলাম অন্য আপুদের নেতৃত্বে বিশাল এক মিছিল উল্টো দিক থেকে এগিয়ে আসছে। আমাদের সবার লক্ষ্য তখন একটাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে গিয়ে মূল স্রোতের সঙ্গে এক হওয়া। কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম, যাওয়ার পথে অন্য হলগুলো থেকেও যেন ছাত্রীরা যোগ দেয়। তাই আমরা এক হল থেকে অন্য হলে ছুটে বেড়াতে লাগলাম। এই ধারাবাহিকতায় আমরা একসময় প্রবেশ করলাম প্রীতিলতা হলে। সেখান থেকে যখন বের হচ্ছিলাম, তখন আমাদের অনেকের হাতেই ছিল লাঠি। যার কাছে যা ছিল- সেটাই লুফে নিয়েছিলাম আমরা। আগের রাতের হামলার ভয়ংকর স্মৃতি তখনো দগদগে। মনের ভেতরের সেই তীব্র নিরাপত্তাহীনতা থেকেই, স্রেফ নিজেদের রক্ষা করার তাগিদে লাঠিগুলো হাতে তুলে নিয়েছিলাম আমরা।
তিনি আরো বলেন, ঠিক প্রীতিলতা হল থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে, খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এক সিনিয়র আপু একটি ভিডিও করেন। আমি বা আমাদের সাথের কেউ ভাবতেও পারিনি, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই সাধারণ ভিডিওটি পরবর্তীতে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে দাবানলের মতো। পরবর্তী দিনগুলোতে আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সেই ভিডিও থেকে ছবি কেটে কেটে দেশের মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে অনেকের কাছে শুনেছি, লাঠি হাতে আমাদের সেই লড়াকু রূপ দেখেই নাকি লাখো মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, বুকে পেয়েছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস।
তিনি বলেন, আমার কাছে এই জুলাই অভ্যুত্থান স্রেফ একটা সরকারের পরিবর্তনের লড়াই ছিল না। আমি নেমেছিলাম যুগ যুগ ধরে চলা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিতে এবং এমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশায়- যেখানে মানুষের নিরাপত্তা থাকবে, শাসকের জবাবদিহিতা থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ বুক ফুলিয়ে, কোনো ভয় ছাড়া নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে।
জ্যোতি বলেন, আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, জুলাই-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের অনেক নেতা মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারেননি। এর ফলে অনেক মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে এবং সেই হতাশার প্রভাব জুলাই আন্দোলনের মূল্যায়নেও পড়েছে। কিন্তু আমার কাছে এই দুই বিষয় এক নয়। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি বা নেতৃত্বের ভুল থাকতে পারে, তার সমালোচনাও হওয়া উচিত। কিন্তু সেজন্য জুলাইয়ের বাস্তবতা, মানুষের আত্মত্যাগ, বৈষম্য বা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যে চেতনা, সেগুলোকে অস্বীকার করা যায় না। আমার কাছে জুলাই একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা, আর সেই চেতনা এখনও প্রাসঙ্গিক।
জ্যোতি বলেন, আজ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি, কিছু ইতিবাচক বদল তো অবশ্যই এসেছে। মানুষ এখন অনেক বিষয় নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি খোলামেলা কথা বলতে পারছে, নিজেদের অধিকারের দাবি জানাচ্ছে নির্ভয়ে। কিন্তু আমি মনে করি, যে ‘জুলাই চেতনা’র জন্য আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনো আমরা দেখতে পাইনি। আমরা শুধু রাজনীতির পালাবদল চাইনি, চেয়েছিলাম মানুষের মূল্যবোধেরও পরিবর্তন আসুক। কিন্তু পরবর্তীতে যখন দেখলাম, এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষই সবসময় সেই পবিত্র চেতনার মর্যাদা ধরে রাখতে পারেননি, কিংবা নিজের স্বার্থে সেটার অপব্যবহার করছেন, তখন বুকটা গভীর হতাশায় ছেয়ে যায়। তবুও আমি আশাহত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিই না। আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো সংস্কার বা পরিবর্তন কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যে বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, নিরাপদ ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন নিয়ে সেদিন লাঠি হাতে আমি প্রীতিলতা হল থেকে বের হয়েছিলাম, সেই স্বপ্নের পুরোটা এখনো বাস্তব হয়নি। আর হয়নি বলেই আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার লড়াইটা আজও ফুরিয়ে যায়নি। কাজ এখনো অনেক বাকি।





