বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি, 'সবার আগে বাংলাদেশ' দর্শনে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি ইশতেহার দিয়েছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে ক্ষমতায় গেলে তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, চাকরি, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশে নয়টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
BNP has unveiled an ambitious election manifesto promising democratic restoration, economic growth, social protection, and justice. From a trillion-dollar economy vision to jobs, welfare cards, education, healthcare, and environmental reforms, the party outlines how it plans to reshape Bangladesh’s future if elected.
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। এই ইশতেহারের মূল দর্শন হলো, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দলটি বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে ব্যক্তি বা দলের স্বার্থ নয়, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে।
ঢাকার একটি হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন। এটি তারেক রহমানের প্রথম নির্বাচনী ইশতেহার। দীর্ঘ বিরতির পর বিএনপি আবার সরাসরি জনগণের সামনে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরল।
বিএনপির নির্বাচনী ইতিহাস ও ইশতেহারের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১২টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিএনপির নেতৃত্ব দেন তার স্ত্রী খালেদা জিয়া। পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন এবং নিজেই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
২০১৮ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি তা বয়কট করে। ফলে তখন কোনো ইশতেহার ছিল না। একাদশ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নিলেও খালেদা জিয়া তখন কারাগারে ছিলেন। তাই সে সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইশতেহার ঘোষণা করেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনও বিএনপি বয়কট করে। সেই হিসেবে দীর্ঘ সময় পর এবার বিএনপি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করল।
পাঁচ ভাগে ইশতেহার, নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি
বিএনপি তাদের ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগে সাজিয়েছে। এগুলো হলো—
১. রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার
২. বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা
৩. ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার
৪. অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন
৫. ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও জাতীয় সংহতি
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার অংশটিকে আবার পাঁচটি উপভাগে ভাগ করা হয়েছে– গণতন্ত্র ও জাতিগঠন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থান, সাংবিধানিক সংস্কার, সুশাসন এবং স্থানীয় সরকার।
বিএনপি মূলত তাদের আগে ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচিকেই এই ইশতেহারের ভিত্তি করেছে। তারেক রহমান বলেন, ৩১ দফা ঘোষণার সময় জুলাই সনদের বিষয়টি সামনে আসেনি। কিন্তু জাতি গঠন ও গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি জানান, ৩১ দফার সঙ্গে জুলাই সনদের অনেক বিষয়ের মিল রয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার
ইশতেহারে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানসহ ‘ফ্যাসিস্ট আমলে’ সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে কোনো পরিবার বা দলের সম্পত্তিতে পরিণত করা ঠিক নয়। তিনি নিরপেক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের ওপর জোর দেন।
সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপি আবারও সংবিধানের মূলনীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের অঙ্গীকার করেছে। তারেক রহমান বলেন, বিএনপিই সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা যুক্ত করেছিল, যা পরে বাতিল করা হয়।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। দলটির মতে, স্থানীয় সরকার স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব।
এছাড়া ইশতেহারে রয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ, সংসদের উচ্চকক্ষ চালু, উচ্চকক্ষে ১০ শতাংশ নারী প্রতিনিধি, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার।
চাকরি, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা
ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা। বিএনপি স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায় পাঁচ লাখ সরকারি শূন্য পদে নিয়োগের কথা বলেছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আলাদা সার্ভিস রুল, পেনশন ফান্ড এবং বেকার ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আইটি খাতে ১০ লাখ নতুন চাকরি সৃষ্টি, নারী-পুরুষ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বৈষম্যহীন বেতন এবং সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি চালুর কথাও উল্লেখ আছে।
দেশের প্রতিটি পরিবার পর্যায়ক্রমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে, যা নারীর নামে ইস্যু করা হবে। পাশাপাশি কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খামারিদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ, কৃষি ও গণমাধ্যম
বিএনপি পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা করেছে। কোন এলাকায় যে গাছ ভালো জন্মায়, সেখানে সেই গাছই লাগানো হবে, যেমন ঢাকার জন্য নিম গাছ। কৃষকদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও নদী খননের মাধ্যমে নৌপথ উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত ও স্বশস্ত্র বাহিনীকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেছে দলটি।
গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা, সাংবাদিকদের কাজের সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমের ওপর আগ্রাসন বন্ধে স্বাধীন রেগুলেটরি বডি গঠনের কথাও আছে ইশতেহারে।
বিএনপির নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি
ইশতেহারে বিএনপি নয়টি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসে আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের পণ্য
২. কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য ও ভর্তুকি
৩. এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ
৪. দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা
৫. তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তা
৬. ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গড়ে তোলা
৭. পরিবেশ রক্ষা ও নদী–খাল পুনঃখনন
৮. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি
বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি জনগণের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি। দলটি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। তাদের ভাষায়, “লুটপাট নয় উৎপাদন, ভয় নয় অধিকার, বৈষম্য নয় ন্যায্যতা”, এই নীতিতেই তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়।
Disclaimer: The views expressed in this article are the author’s own and do not necessarily reflect The Insighta’s editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.





