রক্তে রাঙা সীমান্ত, নীরব ঢাকা
১২ শতাধিক সীমান্ত হত্যা, আড়াই হাজার পুশ-ইন, আর কি.মি প্রতি ৩৫ জন বিএসএফের বিপরীতে মাত্র ১৪জন বিজিবি
সীমান্তে লাগাতার হত্যাকাণ্ড ও জোরপূর্বক ‘পুশ-ইন’ চলছে; সংকট ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। কিন্তু বরাবরই নতজানু নীতি ও মনোভাব দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ফলে এর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো কূটনৈতিক বা আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাহলে কি কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দিয়ে এর বিহিত করা সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব অংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং বিজিবির সক্ষমতা ও জনবল দ্রুত বৃদ্ধি জরুরি।
Bangladesh keeps bowing. As border killings and forced ‘push-ins’ mount and the crisis deepens, Dhaka has taken no effective diplomatic or international response. Can bilateral talks alone be enough? Analysts say no — press India harder, fence Bangladesh side, and rapidly scale up the BGB.
২০০০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, বিগত ছাব্বিশ বছরে ১২শ’রও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ এর হাতে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কৃষক, দিনমজুর, গরু ব্যবসায়ী। এরা কেউই যুদ্ধের ময়দানের যোদ্ধা নন। একই সময়ে হাজার হাজার মানুষকে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশে 'পুশ ইন' করা হয়েছে। অথচ এই ছাব্বিশ বছরে একটিবারের জন্যও বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত হত্যা কিংবা পুশ-ইন এর কারণে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করেনি। নেয়া হয়নি কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ। সীমান্তে জোরদার করা হয়নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এটা দুর্বলতা, নাকি নীরব সম্মতি?
বাংলাদেশের সীমান্ত উত্তেজনা, লাগাতার সীমান্ত হত্যা এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশ-ইন’ নিয়ে সংকট আরো গভীর হয়েছে বর্তমানে। এই সংকটের জন্য গত ১৬ বছরের সরকারের নতজানু নীতি, সীমান্তে দুর্বল অবকাঠামো এবং সীমান্ত বাহিনীর অকার্যকারিতাকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করে নিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট সমাধানে কূটনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশকে নিজস্ব সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের নিজের অংশে কাঁটাতারের বেড়া ও স্মার্ট ফেন্স স্থাপন করতে হবে। ড্রোন, নাইট ভিশন ডিভাইস ও সেন্সর ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমান্তকে প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। দুর্গম ও ফাঁকা এলাকায় ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস স্থাপন করতে হবে। প্রতি কিলোমিটারে বিজিব’র সদস্যদের ঘনত্ব ১৪ জন থেকে উল্লেখযোগ্যহারে বাড়াতে হবে। বর্তমানে বিএসএফ এর তুলনায় বিজিবি আড়াই গুণ পাতলা অবস্থানে থাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ-ইন এর এই ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯২ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘অপারেশন পুশব্যাক’-এর মধ্য দিয়ে এটি প্রথম রাষ্ট্রীয় রূপ নেয়। দিল্লির সীলমপুর বস্তি থেকে ১৩২-১৬২ জন বাংলাভাষী মুসলিমকে কোনো আইনি শুনানি ছাড়াই মাথার চুল ন্যাড়া করে, পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে ট্রেনে তুলে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে বেরিয়ে আসে- ওই মানুষদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের নাগরিকই ছিলেন না। তারা ছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম বা বিহারের বাসিন্দা। কাগজপত্র না থাকায় তারা ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ তকমা পেয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডসের ইতিহাসবিদ উইলেম ভ্যান শেনডেল তাঁর গবেষণায় এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখানো অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় নীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সীমান্ত হত্যার পরিসংখ্যান
আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমান্তে নিহত বাংলাদেশিদের সংখ্যা:
‘অধিকার’-এর দীর্ঘমেয়াদী তথ্যে দেখা যায়, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে মোট ১,২৩৬ জন বাংলাদেশি বিএসএফ এর গুলিতে নিহত এবং ১,১৪৫ জন আহত হয়েছেন। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে আরও অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে বিএসএফ এর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। যার মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর হিসাবে কেবল ২০০০–২০১০ দশকেই ৯০০-র বেশি বাংলাদেশি নিহত হন। সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১০ জন নিহত হন। উল্লেখযোগ্যভাবে, ভারতীয় সূত্রেও (দ্য প্রিন্ট) ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৩, ৪৯ ও ৫১। অর্থাৎ কোনো কোনো বছরে ভারতীয় হিসাবেই বাংলাদেশি সংস্থার চেয়ে সংখ্যা বেশি।
সব মিলিয়ে ২০০০ সাল থেকে সীমান্তে নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ১,২০০ থেকে প্রায় ২,০০০ জন।
পুশ-ইন এর ভয়াবহতা
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারির মধ্যে মাত্র আট মাসে ২ হাজার ৪৭৯ জন ভারতে বসবাসকারীকে বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বিজিবি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি এর মাঠপর্যায়ের তদন্তের তথ্য বলছে, পুশ ইনের আগে ভুক্তভোগীদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে বিএসএফ। যাতে তাদের পরিচয় প্রমাণ করা না যায়। এই ঘটনা ঘটছে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে। ২০২৫ সালে ২৬টি জেলার সীমান্তে বিপুলসংখ্যক সৈন্য মোতায়েন করে চার শিফটে ২৪ ঘণ্টা টহল পরিচালনা শুরু করে বিজিবি। এতে এক সপ্তাহে ২শ’রও বেশি মানুষকে পুশ ইনের ২১টি চেষ্টা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়। পুশ-ইন (অবৈধ অনুপ্রবেশ) এর বিরুদ্ধে বিজিবির কঠোর ও নিয়মভিত্তিক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপ-মহাপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম।
দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক আইন মেনে ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে বৈধভাবে যেকোনো প্রত্যাবর্তনকে বিজিবি সবসময়ই সাদরে গ্রহণ করে। তবে নিয়মবহির্ভূত বা অবৈধ উপায়ে যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশের চেষ্টাকে বিজিবি কোনোভাবেই সমর্থন করে না এবং তা প্রতিহত করতে বিজিবি সর্বদা নিয়ম ও রুলস-বেইজড ম্যানেজমেন্ট বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯২ সালের ‘অপারেশন পুশব্যাক’ (১৩২ জন বিতাড়িত) ছাড়াও ২০০২–২০০৩ সালে বিজেপি-এনডিএ সরকারের আমলেও একই ঘটনা ঘটে। ২০০৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে প্রায় ২০০ বাংলাভাষীকে অস্ত্রের মুখে ঠেলে দেয়া হয়। অর্থাৎ এটি একটি পুনরাবৃত্ত রাষ্ট্রীয় কৌশল।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, কেবল ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যেই দেড় হাজারের বেশি মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়। যাদের অনেককে সংস্থাটি ভারতীয় নাগরিক বলে চিহ্নিত করেছে। ফর্টিফাই রাইটসের তথ্য বলছে, মে ২০২৫-এ ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩০ দিনের মধ্যে ‘অবৈধ অভিবাসী’ যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। এমনকি রোহিঙ্গাদের স্পিডবোটে তুলে সাগরে ঠেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
সীমান্তে অসম লড়াই
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই বাহিনীর মধ্যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে। যা বাংলাদেশের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে কাঠামোগতভাবেই সীমিত করে রাখে।
ভারতের প্রতিটি কিলোমিটারে যেখানে ৩৫-৩৬ জন সীমান্তরক্ষী মোতায়েন থাকে। বাংলাদেশের সেখানে মাত্র ১৪ জন- প্রায় আড়াই গুণ কম। শুধু জনবলই নয়, আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন, নাইট ভিশন সরঞ্জাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বিজিবি অনেক পিছিয়ে।
এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) উপ-মহাপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম দি ইনসাইটাকে বলেন, প্রতিপক্ষ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা সীমান্ত সড়ক থাকলেও বাংলাদেশের পাশে এই সুযোগগুলো নেই। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বিজিবিকে তুলনামূলক বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। যার অংশ হিসেবে সীমান্তে পেট্রোলিং বা টহলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। বিএসএফের তুলনায় বিজিবির সংখ্যা ও সক্ষমতা কম। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি একটি চলমান প্রক্রিয়া। জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যা ভবিষ্যতে বিজিবিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের বেশ কিছু সীমান্তে উভয় দেশই নিজ নিজ ভূখণ্ডে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখায় উভয় পক্ষেই দ্বৈত সারির বৈদ্যুতিক বেড়া ও কনসার্টিনা তার রয়েছে। স্পেনের সেউতা ও মেলিলায় মরক্কোর সঙ্গে তিন স্তরের কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে উভয় পাশেই। হাঙ্গেরি ২০১৫ সালে সার্বিয়া সীমান্তে প্রথম বেড়া এবং পরে দ্বিতীয় বেড়াও নির্মাণ করেছে। এস্তোনিয়া ও লাটভিয়া রাশিয়ার সীমান্তে ধাতব জাল ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। রাশিয়াও নিজ পাশে বেড়া রাখে। পোল্যান্ড ২০২১ সালে বেলারুশ সীমান্তে ১৮৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টিলের দেয়াল নির্মাণ করেছে। বেলারুশও নিজের পাশে বেড়া বজায় রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দুর্বলতাগুলো বেশ স্পষ্ট। প্রতিবেশী ভারত নিজেদের দিকে বেড়া দিলেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত, কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থাকায় নিরাপত্তার দিক থেকে ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। ভারত তাদের সীমান্তের বিশাল অংশ বেড়া দিয়ে ফেললেও বাংলাদেশের নিজের পাশে বেড়া নেই। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪,০৯৬ কিলোমিটারের মধ্যে ৩,২৩২ কিলোমিটারে বেড়া দিয়েছে ভারত। ফলে নিরাপত্তার দায়িত্ব কার্যত একতরফাভাবে ভারতের হাতে চলে গেছে। ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নির্দেশিকায় সীমান্ত থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও কাঁটাতারের বেড়াকে প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো মনে করে না ভারত। এই ব্যাখ্যার বিরোধ বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থানে রেখেছে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে এখনো প্রায় ৮৬৪ কিলোমিটার বেড়াহীন রয়েছে। যার মধ্যে ১৭৩ কিলোমিটার কঠিন ভূপ্রকৃতির কারণে বেড়া দেওয়াই সম্ভব নয়। এই খোলা অংশগুলো দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পাচার ও চোরাচালান অব্যাহত রয়েছে।
সীমান্ত সংকট নিয়ে কথা হয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসিরের সাথে। যিনি বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে গঠিত ওই কমিটিকে আনিসুজ্জামান খান তদন্ত কমিটি বলা হতো। তদন্তের সময় উদঘাটিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য মূল প্রতিবেদনে স্থান দেয়া হয়নি বলে সেসময় অভিযোগ তুলেছিলেন হাসান নাসির। প্রতিবেদনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মূল নেপথ্য কুশীলব ও পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে কোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা নেয়া হয়নি বলেও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দেয়ায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির দ্বিমত পোষণ করে সেই প্রতিবেদনে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি নেক্সাস ডিফেন্স এণ্ড জাস্টিস নামের একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দি ইনসাইটার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় সীমান্তের এই সংকট মোকাবিলায় তিনি বিজিবির চেয়েও সীমান্ত এলাকার সাধারণ জনগণের প্রতিরোধ ও সচেতনতাকে বেশি কার্যকর মনে করছেন। বর্তমান সীমানা পরিস্থিতিকে একটি ‘অস্বাভাবিক বর্ডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, সীমান্তে অপরাধের আইনি বিচার বা জেল-হাজতের পরিবর্তে সরাসরি গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় বাহিনী। যা কোনো বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশের লক্ষণ নয়। এছাড়া সীমান্ত এলাকায় ভারতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তিনি। বলেন, সরকারকে দেশের ভেতরে ও বাইরে এই সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন ও মোকাবিলা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও ভারতের অবস্থান
এই পুশ ইনকে ‘অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো’ বলে দাবি করে ভারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বলছে ভিন্ন কথা। প্রথমত, ‘নন-রিফুলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন জায়গায় ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতা হুমকির মুখে। দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী, কাউকে বহিষ্কার করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রিজন ভ্যানে করে রাতের অন্ধকারে সীমান্তে ছেড়ে দেয়া সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী ।
ভারত সীমান্ত হত্যাকাণ্ডকে ‘আত্মরক্ষামূলক’ বলে দাবি করে। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ORF)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ভারতের ভাষ্যে নিহতদের অনেকেই রাতের অন্ধকারে অনুপ্রবেশকারী গরু, মাদক বা অস্ত্র চোরাকারবারি। তাদের হিসেবে, ২০১০ সালে ৩২ জন ‘অনুপ্রবেশকারী’ নিহত ও ৬৪ জন বিএসএফ সদস্য আহত হন। আর ২০১২ সালে রাবার বুলেট ব্যবহার শুরু হলে নিহত হন ১১ জন। কিন্তু আহত বিএসএফের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫০। তবে এই যুক্তির দুর্বলতাও ভারতীয় গণমাধ্যমই তুলে ধরেছে: দ্য প্রিন্ট-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুলি করে হত্যার সঙ্গে চোরাচালান কমার সরল কোনো সম্পর্ক নেই। মূল বক্তব্য তাই হওয়া উচিত- কেউ চোরাকারবারি হলেও বিচারবহির্ভূতভাবে নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১০ সালের ‘ট্রিগার হ্যাপি’ প্রতিবেদন বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি ও ভারতীয়- উভয় দেশের নাগরিকের বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও নির্বিচার আটক নথিভুক্ত করে। সংস্থাটি পরবর্তী প্রতিবেদনেও উল্লেখ করেছে—মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত কোনো বিএসএফ সদস্যের বিচারের নজির কার্যত নেই; অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতা। কলকাতাভিত্তিক ভারতীয় সংস্থা মাসুম (MASUM)-ও একই অভিযোগ নথিভুক্ত করে- এটি কেবল বাংলাদেশের অভিযোগ নয়।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে ১৫ বছরের ফেলানি খাতুনকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। তার মরদেহ সাড়ে চার ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে থাকে। কাঁটাতারে ঝুলন্ত সেই ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। অভিযুক্ত কনস্টেবল অমিয় ঘোষকে বিএসএফের বিশেষ আদালত ২০১৩ ও পুনর্বিচারে ২০১৫ সালে খালাস দেয়। পনেরো বছর পরও মামলাটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে।
বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতা ও নতজানু পররাষ্ট্রনীতি
বিএসএফের হাতে বিগত ছাব্বিশ বছরে ১২শ’র বেশি মানুষ নিহত হলেও বাংলাদেশ সরকার সেই হিসেবে ভারতীয় হাই কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করেনি। অথচ ভারত বহুবার তুলনামূলক ছোট ইস্যুতে বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে ডেকে পাঠিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ ভারতীয় উপ-হাই কমিশনারকে তলব করেছিল বাংলাদেশ। যদিও সেটা সীমান্ত হত্যা কিংবা পুশ ইনের জন্য নয়, বরং আসামের মুখ্যমন্ত্রীর একটি মন্তব্যের প্রেক্ষিতে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুই বার বাংলাদেশী হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করা হয়। এর আগে জানুয়ারিতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ নিয়ে উপ-হাইকমিশনারকে তলব করে নয়াদিল্লি। বিপরীতে। ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশও সক্রিয় হয়েছে- জানুয়ারিতে সীমান্তে বিএসএফের তৎপরতা ও সুনামগঞ্জে এক বাংলাদেশি হত্যার প্রসঙ্গ তুলে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে ঢাকা। তবে পুশইনের বিষয়ে বাংলাদেশ সেই অর্থে ভারতের কাছে কোনো ব্যাখ্যা চায়নি কিংবা তলব করেনি।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যদি কেউ অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অপরাধে জড়িত থাকে, তাহলে বিএসএফ এর হাতে তার মৃত্যুকে ‘বর্ডার কিলিং’ বলা উচিত নয়। এই বক্তব্য কার্যত ভারতের বহু বছরের অবস্থানকেই স্বীকৃতি দিয়েছে এবং দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে লড়াই করেছে- সেই অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া, বাংলাদেশ এই ইস্যুটিকে সবসময় ‘দ্বিপাক্ষিক’ কাঠামোয় আটকে রেখেছে। যা ভারতের জন্যই সুবিধাজনক। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে, ইউএনএইচসিআর-এ বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে এই বিষয়টি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তোলা হয়নি। বারবার প্রতিশ্রুতি, বারবার ব্যর্থতা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুহার শূন্যে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেয় দুই দেশ। কিন্তু সেই বছরেই বিএসএফ এর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশী নিহত হন। প্রতিটি বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকে একই প্রতিশ্রুতি, একই ব্যর্থতা। অথচ কোনো পক্ষকে জবাবদিহি করতে হয়নি কোনোদিন।
সীমান্তে অবৈধ ‘পুশইন’ প্রসঙ্গে সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো দেশে অবৈধ নাগরিক থাকলে তাকে ফেরত পাঠানোর একটি সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। যা দুই দেশের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু সেই নিয়ম না মেনে জোরপূর্বক পুশইনের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পুশ-ইন এর প্রতিবাদে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লিকে গুরুত্বের সাথে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের প্রায় ২৬টি জেলার সীমান্ত জুড়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অত্যন্ত কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই অবৈধ পুশইনের চেষ্টাগুলো সফলভাবে প্রতিহত করছে। বাংলাদেশ সরকার আশা করে, ভারত সরকার বিষয়টি সংবেদনশীলতার সাথে বিবেচনা করবে এবং যেকোনো নাগরিক সংক্রান্ত সংকট সুনির্দিষ্ট আইনি ও কূটনৈতিক পন্থায় সমাধান করবে, সীমান্তে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশ সরকারের জোরালো অবস্থান প্রমাণ করে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন দি ইনসাইটাকে বলেন, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ভারতকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়েছে। জুলাই বিপ্লবোত্তর অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও বৈশ্বিক মিশনগুলোর কৌশলগত অবস্থান মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কূটনৈতিক রূপরেখা দাঁড় করাতে সরকারকে আরও কিছু সময় দেওয়া প্রয়োজন।
সীমান্ত সুরক্ষা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক অধিকার ও সম্মানের ভিত্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক বলেন, সীমান্ত হত্যা বা পুশ-ইনের মতো স্পর্শকাতর সংকটে কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি-বিএসএফ) পতাকা বৈঠক বা তাৎক্ষণিক হাতাহাতির মতো স্থানীয় সমাধানের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শক্তিশালী বার্তা দেওয়া জরুরি। সংবাদ সম্মেলনে কেবল ‘ছাড় না দেওয়ার’ মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে এই বক্তব্যগুলোর বাস্তব রূপায়ণই এখন মূল বিবেচ্য বিষয়। তিনি বলেন, ভারতকে এমন একটি জোরালো বার্তা দিতে হবে যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ নিজের সীমান্ত রক্ষায় এবং জাতীয় আত্মসম্মান বজায় রাখতে কোনোভাবেই দুর্বল নয়, বরং অত্যন্ত তৎপর ও সক্ষম।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে সীমান্ত হত্যার বিষয়ে “নিষ্ক্রিয় শোষণ বা গ্রহণ” নীতি অনুসরণ করেছে। এর ফলে ভারত কার্যত বুঝে গেছে যে হত্যা করলেও বড় কোনো পরিণতি নেই। বর্তমান সরকার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।
সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন সমস্যার জন্য মূলত গত ১৬ বছরে সরকারের দুর্বল অবস্থান এবং ২০০৯ সালের পর বিডিআর অকার্যকর হয়ে পড়াকে দায়ী করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির। তাঁর মতে, আগে সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের যেকোনো হত্যাকাণ্ডের জবাবে পাল্টা প্রতিরোধ বা কাউন্টার অ্যাকশন নেয়া হতো। বর্তমানে এটি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তিনি বলেন, কোনো বাংলাদেশি অর্থনৈতিক কারণে পশ্চিমবঙ্গে যাবে না। বরং রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাভাষী মুসলমানদের পুশ-ইন করার চেষ্টা করছে ভারত। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীদের দেশে ফেরত আনার দাবি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সরকারি পর্যায়ে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে বাংলাদেশকে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, কূটনৈতিক পদক্ষেপ এর অংশ হিসেবে প্রতিটি সীমান্ত হত্যা ও পুশ ইনের ঘটনায় ভারতীয় হাই কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করতে হবে এবং লিখিত প্রতিবাদ নোট পেশ করতে হবে। তারা বলছেন- এটি কোনো যুদ্ধের ঘোষণা নয়, এটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক দায়িত্ব। এছাড়া জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে, ইউএনএইচসিআর-এ এবং আন্তর্জাতিক আদালতে তথ্য-প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করতে হবে। এই ইস্যুকে কেবল দ্বিপাক্ষিক কাঠামোয় আটকে না রেখে বহুপাক্ষিক মঞ্চে নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি তৈরি করতে হবে নিজস্ব সীমান্ত সুরক্ষা। প্রয়োজনে বাংলাদেশের নিজের অংশে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করতে হবে। বাড়াতে হবে বিজিবির সংখ্যা ও সক্ষমতা।
এছাড়া পুশ-ইন হওয়া প্রতিটি ব্যক্তির বায়োমেট্রিক তথ্য, ছবি এবং বক্তব্য রেকর্ড করে কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করতে হবে। বর্তমানে মাত্র ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা গেছে। অথচ ২,৪৭৯ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। বাকিদেরকে এখনো যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার আওতার মধ্যেই আনতে পারেনি বাংলাদেশ। এই তথ্য ঘাটতি আইনি লড়াইকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক ড. নাজমুস সাকিব নির্ঝর দি ইনসাইটাকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর সবচাইতে প্রাণঘাতী সীমান্ত। ভূমধ্যসাগর দিয়ে বহু মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করলেও কিংবা মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে ড্রাগ কার্টেলগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহভাবে মানব পাচার করলেও, বিশ্বের আর কোনো সীমান্তে এভাবে পাখির মতো গুলি করে মানুষ মারার নজির নেই।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক ঐকতান সৃষ্টি হয়েছে। যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই সমন্বয়ের ফলে পশ্চিমবঙ্গে আসামের মতো ডিটেনশন ক্যাম্পের মডেল তৈরি এবং নাগরিকত্ব আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পুশ-ইনের আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে নিয়ে সীমান্তবর্তী সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নথিবদ্ধ (ডকুমেন্ট) করার ব্যবস্থা করা। পুশ-ইনের চেষ্টা হলে দ্রুত মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্ব গণমাধ্যমকে জানানো। বিজিবির পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত করে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। পুশ-ইনের চেষ্টা হওয়া মাত্রই বাংলাদেশের মানবাধিকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সাংবাদিক এবং জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের যত দ্রুত সম্ভব সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।







