যারা হাদিকে ঘৃণা করে, যারা হাদিকে ভালোবাসে
শরিফ ওসমান হাদি বড় নেতা না হয়েও সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তাই কাজ কম হলেও মানুষ তাকে ভালোবেসেছে, স্মরণ করেছে, আর তার মৃত্যু তাকে এক বিপ্লবী প্রতীকে পরিণত করেছে।
He had no office, no title, and no long list of achievements. Yet millions felt he spoke for them. This article challenges conspiracy theories and explains why Hadi’s voice, not power, made him unforgettable.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অগ্র সৈনিক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীকে হত্যার দুই মাস হতে চললো। ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। জীবিত হাদির মতো মৃত হাদিকে নিয়েও মানুষের আলোচনা, আগ্রহের কমতি নেই। সম্প্রতি হাদিকে নিয়ে একটি সমালোচনামূলক লেখা ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। যার প্রেক্ষিতে দৈনিক সমকাল পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার রাজিব আহমদ ৮ ফেব্রুয়ারী তার ফেসবুক পোস্টে একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছেন। তাঁর লেখাটি কিছুটা পরিমার্জন করে দ্য ইনসাইটা’র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
হাদির অবদানটা কী- প্রশ্ন তুলে ফেসবুকে একটি ভাইরাল লেখা দেখলাম। যে লেখার মূল সারমর্ম হলো, হাদিকে হাদি নিজেই মেরে ফেলেছে কিংবা বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের কেউ মেরেছে। (বিএনপি সাজতে আজকাল অনেকে দলটিকে খুশি করতে অনেক কিছু লেখে)।
১.
হাদির অবদান কী- এই প্রশ্নে জবাব দেওয়ার আগে প্রশ্ন করি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অবদান কী? সিরাজের ১৩ মাসের শাসনামল ঘাঁটলে কোনো অবদান খুঁজে পাবেন না। কিন্তু ২৬৯ বছর পরও তরুণ সিরাজ একইরকম জনপ্রিয়, শ্রদ্ধেয় এবং রূপকথার রাজপুত্র। ইংরেজ শাসনে ১৯০ বছর সিরাজের চরিত্রহননের চেষ্টা করেও কাজ হয়নি। সিরাজ হেরেও এত বছর পরও স্বাধীনতা-সাহস-শৌর্যের প্রতীক। অথচ বহু বিজয়ীর নাম ইতিহাস থেকে মুছে গেছে।
হাদিও তেমন। হাদি মৃত্যুর আগের ১৬ মাসে পাবলিক লাইফে উল্লেখযোগ্য কিছুই করেনি। শুধু একটা কাজ করেছে, সাধারণ মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, তা বলেছেন। সাধারণ মানুষ যে কথাটা বলতে চায়, তা বলেছেন। সহজ কথায় বলেছে। ব্যস এতটুকু।
কোটি মানুষ বহু বছর অপেক্ষায় ছিলেন, তার অন্তরের কথাটা কেউ সহজ করে বলবে। ভনিতা ছাড়া বলবে। রাখডাক ছাড়া বলবে। হাদি তাদের কণ্ঠস্বর ছিলেন।
এটা কারো কাছে খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু হাদি যাদের আওয়াজ ছিলেন, তারা জানেন এটা কত বড় কাজ। এ কারণেই পর্দার নায়ক মান্না গরিবের প্রতিনিধি। শোষিতের প্রতিনিধি। ঢাকার এলিট বিদগ্ধ সমাজ মান্নার গালগালি পূর্ণ সংলাপে নাট সিটকাতেন। কিন্তু মান্না যে গরিবদের হয়ে পর্দায় অত্যাচারীকে পেটাতেন, সেই গরিবরা মান্নার মৃত্যুর পর ঢলের মতো এসেছিল। ১৮ বছর পরও শ্রদ্ধায় ভালোবাসায় মনে রেখেছে।
সে কারণেই হাদি কিছু না করেও রূপকথার চরিত্রের মত। ধূমকেতুর মত। আশ মেটার আগেই চলে যাওয়া। এই প্রস্থানই তাঁকে অমর করে তুলেছে। কারণ, মানুষ তার মুখপাত্রকে হারিয়েছে।
যারা ক্ষমতার সঙ্গে থাকে, যার নিজের কণ্ঠস্বর আছে, সে কখনই বুঝবে না এই ধূমকেতুর পতনের বেদনা।
২.
ষড়যন্ত্র তত্ত্বমূলক লেখাটিতে প্রশ্ন ছিল, নাহিদ, হাসনাত, সারজিস, সাদিক, আসিফ বা মাহফুজের মত বড় নামগুলোকে পাশ কাটিয়ে হাদিকে কেনো বেছে নেওয়া হলো? লীগ এদের কাউকে না মেরে জুলাই আন্দোলনের থার্ড লেয়ারের আন্দোলনকারী ওসমান হাদিকে মারলো?
লেখাটিতে আরও বলা হয়েছে, যেহেতু ঘরের খেয়ে বনে মোষ তাড়ানোর মত কাজে ফান্ডিং পাচ্ছিল তার মানে হাদির পেছনে বড় কারো আশীর্বাদ ছিল। বিখ্যাত না হয়েও কেনো হাদি বারবার তাঁর মৃত্যুর কথা বলত- এই প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কিন্তু এখানে সচেতনভাবে কিছু জিনিস এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন হাসনাত আজকাল যেখানেই যাক, লোকজনের কাছ থেকে টাকা পায়। লোকজন জোর করে দিয়ে যায়। চোখের দেখা হচ্ছে, এটা হাদিও পেত। দিনে লাখ টাকার বেশি করে উঠেছে হাদির ক্রাউড ফান্ডিংয়ে। এর কারণ, হাদি যাদের কণ্ঠস্বর ছিল, তারা দিত।
এটাকে অবশ্য পপুলিজম বলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, ‘একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মানুষ হাদির অডিয়েন্স ছিলেন’। কিন্ত লেখক ভদ্রলোক হয়ত জানেন না, এই গন্ডিটাই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ। যারা বাঙালির চেয়ে বেশি বাংলাদেশি। আবার খুব ধার্মিক না হলেও তাদের মুসলিম পরিচয়ে গর্বিত বোধ করেন, আবার ট্যাগও খান।
হাদি এই ট্যাগের ‘শাউয়া মাউয়া ছিঁড়ে’ ফেলার কাজটা শুরু করেছিলেন। নিজের ধর্ম পরিচয় বুক ফুলিয়ে দিতেন। যা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনের চাওয়া। ওই যে মান্নার মত- যে মান্না হতে পারে না- কিন্তু মান্নার মধ্যে নিজের সংগ্রামকে দেখে, মান্নার জয়ে নিজের জয় দেখে।
এ কারণে মৃত্যুর এতদিন পরও হাদির কবরের সামনে এখনও রোজ মানুষ জমায়েত হয়, চোখের পানি ফেলে। যা কোনো বিখ্যাত বা ন্যাশনাল লেভেলের লোকের জন্য হয় না।
৩.
লেখায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে- হাদি কেনো বারবার নিজের মৃত্যুর কথা বলত। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু অস্পৃশ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেই এরকম প্রশ্ন আসে। গরিব এবং বাংলাদেশি মুসলমান, সারাদিনই নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে। এটা হয় ধর্ম বিশ্বাস থেকে।
কিন্তু লেখায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, হাদিকে হত্যার হুমকির কথা। হাদি নিজেই ১৪০টি ভারতীয় নম্বর ফেসবুকে শেয়ার করেছিলেন। যেগুলো থেকে গালাগালি করা হতো, হত্যার হুমকি দেওয়া হতো।
জুলাই অন্য নেতাদের বাদ দিয়ে হাদিকে টার্গেট করা হয়েছিল- প্রশ্ন তোলা হলেও, ঘটনাক্রমকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ফেসবুকে হাসনাত, সাদিকদের নম্বর ঠিকানা লিক করে কেউ হুমকি তৈরি করেনি। লীগের ডাল্টনরা হাদির ক্ষেত্রে তা করেছিল। হাদিকেই প্রধান লক্ষ্য করে তুলেছিল তাঁর বয়ানের কারণে। শক্তিশালী ভাষণের কারণে।
ভাষণের কারণেই মরতে হয়েছিল মার্টিন লুথার কিংকে। ম্যান্ডেলাকে জেলে যেতে হয়েছিল। ভাষণের কারণেই, শেখ মুজিব অবিসংবাদিত নেতা হয়েছিলেন। দক্ষ কর্মী সংগঠক আরও ছিলেন, তারা পারেননি। রাজনীতির প্রধান শক্তিই জনগণকে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারার ভাষণ।
৪.
হাদির খুনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের বিষয়েও কিছু বিভ্রান্তি তৈরা হয়েছে লেখায়। লেখা হয়েছে, ‘ফয়সালের বাসায় কিছু চেক পাওয়া গেছে, যেগুলোর মোট মূল্য ২১৮ কোটি টাকা। জুলাই আন্দোলনের থার্ড লেয়ারের একজন কর্মীকে, ইনকিলাব মঞ্চের প্রধানকে মারতে কেউ একজন ২১৮ কোটি টাকা দিয়েছে!!!’
একটা টেলিভিশন এই ভুল নিউজ ছড়ালেও, পরে সরিয়ে দেয়। আর এটা দিয়ে এখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি করা হচ্ছে। বলা হয়েছে, ‘এসব চেক ভাঙানোও হয়নি। ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রী, প্রেমিকা, পরিবার সব ধ্বংস হয়েছে। ফয়সাল ২১৮ কোটি টাকা থেকে একটা টাকাও নিতে পারেনি। আর ২১৮ কোটি টাকার কাজ এতো কাঁচা হবার কথা না। তুরস্ক থেকে আন্তর্জাতিক মানের শুটার ভাড়া করে আনার কথা।’
সত্যটা হচ্ছে, ফয়সালের অ্যাকাউন্টে পুলিশ ১২৭ কোটি লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। প্রথম কথা হচ্ছে, লেনদেন আর ব্যাংকে ১২৭ কোটি টাকা থাকা এক জিনিস নয়। আমার ব্যাংকে এক লাখ টাকাও নেই। কিন্তু গত ১৭ বছরে কয়েক কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। মানে কখনো ৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছি। ওইটা আবার দুইদিন পর অন্যজনকে দিয়েছি। সে আবার ১০ দিন পর ফেরত দিয়েছে। এভাবে ৫ লাখ টাকায় ৫০ লাখ টাকার লেনদেন হয়ে যায়। আর কোনো চেকবইয়ে সই করা থাকা মানেও টাকার পরিমাণ বোঝায় না।
৫.
আরেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হলো, হাদিকে আড়াই মাস পরও নানা মিম-পেইজ হাদিকে নিয়ে পোস্ট করা হচ্ছে। এটা আমি নিজেও দেখেছি। এটার অনুসন্ধান করে দেখেছি, হাদিকে নিয়ে লিখলে লাইক পাওয়া যায়। তাই মাছ বিক্রির পেইজও পোস্ট দেয়, ‘হাদির ছবি সামনে পড়লে একটা রিয়েক্ট দেবেন। হাদি ভাইকে ভুলতে দেবেন না’।
হাদির প্রতি তীব্র ভাবাবেগ থাকা সাধারণ মানুষ ভালোবাসা দেখাতে লাইক লাভ দেয়। এতে ওই পেইজের রিচ বাড়ে। এটা হচ্ছে, হাদিকে ব্যবহার করে ব্যবসা করা।
এই ব্যবসাকে ভুলভাবে তুলে ধরলেও, লেখাটাতে বারবার অভিযোগ আনা হয়েছে হাদিকে নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা হচ্ছে। এটা সত্য। অবশ্যই হচ্ছে। হাদি তুমুল জনপ্রিয়। রাজনৈতিক দলগুলো তার পিআর ক্যাম্পেইনে হাদিকে নিয়ে আসে। জামায়াত, এনসিপি বারবার আনে। বিএনপি ভিডিও বানায়। তারেক রহমান দেশে ফিরে হাদির কবরে যান। সবই পিআর।
কিন্তু হাদিকে যে সাধারণ মানুষ ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে কথা হলে বুঝি তারা পিআরের ধার ধারে না। নিজের আওয়াজ হারানোর বেদনায় সিক্ত তারা।
৬.
হাদির পরিবার সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রত্যাখান করে বিচারের দাবিই কেনো প্রধান করে তুলছে না- এ প্রশ্ন ভ্যালিড। হত্যার বিচারের দাবিতে নির্বাচনের প্রাক্কালে সংবেদনশীল সময়ে ইনকিলাব মঞ্চ কেনো যমুনা ঘেরাও করতে গেলো- এই প্রশ্নও ভ্যালিড। গতকাল এ নিয়ে দুটি লেখা লিখেছি। কেনো এই সময়ে যমুনায় গিয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি।
আবার বলছি, যমুনায় যাওয়া অনুচিত ছিল। সেখানে তারা মার খেয়েছে- এ নিয়ে সহানুভূতি নেই। কিন্তু শাহবাগে কেনো এমন আক্রোশ নিয়ে মারা হলো? এটার ব্যাখ্যা পেলাম না।
লেখার বিষয়ে আলাপ শেষ। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হল,
বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করা লোকের একাংশ হাদিকে তীব্র অপছন্দ করে। এটা স্রেফ ঈর্ষা। এর কারণ হলো, কিছু না করেও হাদি রূপকথার চরিত্র হয়ে গেলো, আর আমি অ্যাক্টিভিজম করেও শুধু ফেসবুকে আটকে রইলাম।
নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে জামায়াত ও এনসিপি এখন বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই বিএনপির কোলে উঠতে চেষ্টা করা সকলের এখন সহজ পথ হল, জামায়াত বিরোধী কিংবা এনসিপিকে গালাগালি করা।
কিন্তু না এরা অতীতে জামায়াত বিরোধী ছিল, না বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে অ্যালাইন ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় যেহেতু বিএনপি যাচ্ছে, এটা ধরে নিয়ে বিএনপিকে তোষণের লাইনে আলাপ দিচ্ছে। আপনি লিখে রাখুন, জামায়াত যদি ক্ষমতায় যায়, এরাই তখন জামায়াতের কোলে উঠতে লিখবে হাদি হত্যায় বিএনপির হাত থাকলেও থাকতে পারে। বিএনপিকে দায়ী করে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে হাজির হবে। ক্ষমতাই তাদের কেবলা পরিবর্তন করবে।
কিন্তু হাদি সাধারণের হয়ে আছেন, থাকবেন।
About the Author
Rajib Ahamod is a Bangladeshi journalist. He has been working for the daily Samakal since 2009. His areas of work include politics, political analysis, human rights, labor protection, and infrastructure development.
Disclaimer: The views expressed in this article are the author’s own and do not necessarily reflect The Insighta’s editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.

