হাদি হত্যা ও বিচারহীনতার গোলকধাঁধা, রাষ্ট্রের ‘স্মৃতিভ্রম’ নাকি সুপরিকল্পিত নীরবতা?
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার মানে কি শুধুই অপেক্ষা? সাগর–রুনীর মতো হাদি হত্যাও ধামাচাপা দিতে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলো কি বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর সুবিধাবাদে মেতে উঠেছে?
In Bangladesh, justice has become an exercise in delay. From Sagar–Runi to Osman Hadi, murders sink into procedural limbo as state agencies and political parties prioritize damage control over accountability, entrenching a culture of impunity and eroding public trust in the rule of law.
বাংলাদেশে ‘ন্যায়বিচার’ শব্দটির সমার্থক এখন ‘অপেক্ষা’। প্রশ্ন জাগে আমরা কি কেবলই দিন গুনি, নাকি রাষ্ট্র আমাদের ভুলিয়ে দেওয়ার সুনিপুণ কৌশলে অভ্যস্ত করে তোলে? সাংবাদিক সাগর-রুনী হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ যখন শতবার পেছায়, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে’ নয়, বরং ‘আইন তার নিজস্ব বৃত্তে’ ঘুরপাক খাচ্ছে। ওসমান হাদি হত্যার ক্ষেত্রেও আমরা কি সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি দেখতে যাচ্ছি?
বিচারের সংস্কৃতি বনাম কাঠামোগত উদাসীনতা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘Culture of Impunity’ বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এমন সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীনরা তাদের অপকর্মগুলো ভয়-ভীতি ছাড়া অবলীলায় করে যায়। যখন কোনো হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়, তখন রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন- এনএসআই, ডিজিএফআই বা পুলিশ) বিচারের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং ‘ম্যানেজমেন্ট’ বা ধামাচাপার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। হাদি কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন সমাজ ও সংস্কৃতি পরিবর্তনের এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার পর যখন প্রশাসন আমাদের ‘সর্বোচ্চ চেষ্টার’ গল্প শোনায়। যে গল্প আসলে ‘Institutional Gaslighting’ ছাড়া আর কিছুই নয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্র আপনাকে বিশ্বাস করাতে চায় যে তারা কাজ করছে, অথচ দিনশেষে ফলাফল সেই ‘শূন্য’ বা ঝুড়িভর্তি ‘ঘোড়ার ডিম’।
‘আসিফীয়’ নীরবতা ও গদিবদল
সরকারের অনেক কুশীলব ক্ষমতার বাইরে থাকতে যে পরিমাণ ‘বাক-বিস্ফোরণ’ ঘটাতেন, গদিতে বসার পর তাদের সেই তেজ এখন যেন নিস্তেজ মোমবাতির মতো হয়ে গেছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আইন বিভাগের এক সময়ের তুখোড় শিক্ষক ও বর্তমান উপদেষ্টা দেশের আইনাঙ্গণের কোন সংস্কার না করতে পারলেও যিনি নিজের নামের যে সংস্কার লেখালেখি জীবনরে শুরুতে করেছিলেন সেটাই ভাঙ্গিয়ে খাচ্ছেন। নিজের নামের শেষাংশ থেকে ‘ইসলাম’ ছেঁটে ফেলে প্রথমে ‘আসিফ’ যুক্ত করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাগিং কালচার নিয়ে বই লিখে তিনি ছাত্রদের হৃদয়ে বিপ্লবের সুবাস ছড়িয়েছিলেন। আইনের বুলি আওড়ানো ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।
আবেগে আপ্লুত হয়ে তিনি একবার বলেছিলেন ”হায় আল্লাহ! আমার খালি মনে হয় আমি যদি একবার কোনো মন্ত্রণালয় বা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেতাম, মানুষের জন্য জীবন দিয়ে কাজ করতাম, হৃদয় দিয়ে মানুষকে ভালোবাসতাম আর মানুষের হৃদয় জয় করতাম। মানুষের হৃদয় জয় করা মানেই আল্লাহর হৃদয় জয় করা।”
আজ জনতা প্রশ্ন করতে চায় সেই হৃদয় জয় করার আকাঙ্খা কি ক্ষমতার ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল? বিপ্লবের সেই ‘সোল এজেন্ট’রা এখন কি ক্ষমতার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আরামদায়ক ঘুমে বিভোর? হাদি হত্যার বিচার যখন জনভোগান্তির দোহাই দিয়ে হিমাগারে পাঠানো জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এক শ্রেণীর গাদ্দার, তাদেরই সমর্থন দিচ্ছে ক্ষমতাবানরা। এমন পরস্থিতিতে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা মানুষেরও বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি নিছক উদাসীনতা নয়, বরং এক প্রকার ‘Political Opportunism’ বা রাজনৈতিক সুবিধাবাদ।
রাজনৈতিক দলগুলোর উদাসীনতা: লাশের ওপর রাজনীতির হিসাব
হাদির বিচারের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এখন ‘অপেক্ষমাণ নীতি’র ওপর দাঁড়িয়ে। তারা ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসাব কষছে এই বিচার চাইলে ভোটের বাক্সে লাভ কতটুকু? যদি লাভ না থাকে, তবে হাদিও কি সাগর-রুনীর মতো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ তারিখ হয়েই বেঁচে থাকবেন? দলগুলোর এ নীরবতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে গুম-খুন এখন ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি মাত্র। যখন প্রয়োজন হয়, তখন একে ইস্যু বানায়। আর যখন মসনদ নিশ্চিত হয়, তখন ফাইল চাপা দেওয়া হয়। অথচ এই ‘হাঁটু বয়সের’ হাদিরা রাজপথে বুক না পাতলে আজ অনেক বাঘা বাঘা নেতাকেও অনলাইনেই সভা-সমাবেশ সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপনই ছিল তাদের জন্য অসম্ভব।
আন্দোলনের বিকল্প কী?
যদি এনএসআই বা ডিজিএফআই-এর মতো সংস্থাগুলো হাদি হত্যার কিনারা না করেই পার পেয়ে যায়, তবে ধরে নিতে হবে এ দেশে ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social contract) পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের বুঝতে হবে, আজ হাদির বিচার না হলে কাল আপনার বাবা, ভাই, সন্তান বা বন্ধুর লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে। তখন আর বিচারের দাবি নিয়ে রাজপথে আসার নৈতিক কোন অধিকার আপনাদের থাকবে না।
জুলাইয়ের হাজারো শহীদ আর আহতদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যারা আজ ক্ষমতায় বসে আয়েশি জীবন যাপন করছেন, তাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। নিজেদের বিবেকের কাছে জিজ্ঞাসা করুন, জনগণ কি আপনাদের ‘মোটা-তাজা’ হওয়ার জন্য এই চেয়ারে বসিয়েছে? যদি রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার মতো হিম্মত আমাদের না থাকে, তবে সব ক্ষোভ বিসর্জন দিয়ে নির্লজ্জের মতো ক্যারিয়ার আর ব্যবসার হিসাব মেলান। মনে রাখবেন, বিচার না চাওয়া মানে পরবর্তী খুনিকে আপনিই আগাম লাইসেন্স দিয়ে রাখছেন।
About The Author
Rejaul Haque Kawshik is a Ph.D. student at Colorado State University, USA. He can be reached at rejaulju@gmail.com
Disclaimer: The views expressed in this article are the author’s own and do not necessarily reflect The Insighta’s editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.


