স্মার্ট এনআইডি থাকতেও নতুন নতুন কার্ডের ধুম, হাজার কোটির চিপ রেখে পেছনে হাঁটছে সরকার
হাজার কোটি টাকায় তৈরি স্মার্ট এনআইডির চিপ ব্যবহারের অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও প্রকল্প-সংস্কৃতির প্রভাবে আসছে নতুন নতুন কার্ড। আলাদা কার্ডে ভারী হচ্ছে নাগরিকের পকেট।
Despite spending nearly $80 million on chip-embedded Smart NID cards designed to unify all citizen services, Bangladesh's government agencies continue launching separate family, health, and LPG cards. Officials and technologists tell The Insighta that bureaucratic silos, missing card-reader infrastructure, and a project-driven culture have left the smart chip's potential locked inside the plastic.
উন্নত বিশ্বের বহু দেশে যখন একটি মাত্র ‘অল-ইন-ওয়ান’ স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে একজন নাগরিকের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করছে, তখন বাংলাদেশে ঘটছে ঠিক তার উল্টো চিত্র। নাগরিকদের উন্নত ডাটাবেজ এবং আধুনিক চিপযুক্ত ‘স্মার্ট ন্যাশনাল আইডি (এনআইডি) কার্ড’ থাকা সত্ত্বেও তার কোনো কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে তৈরি এই স্মার্ট কার্ডকে এক প্রকার অকেজো রেখে সরকার একের পর এক নতুন ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কিংবা এলপিজি কার্ডের মতো ভিন্ন ভিন্ন কার্ডের ঘোষণা ও বিতরণ করছে।
রাষ্ট্রীয় সেবা এক সুতোয় গাঁথার লক্ষ্য নিয়ে প্রায় দেড় দশক আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস’ (আইডিইএ) প্রকল্প শুরু হয়েছিল। অত্যন্ত আধুনিক এবং সুরক্ষিত চিপ ও বারকোড সম্বলিত এই স্মার্ট কার্ড তৈরিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি) ব্যয় হয়ে গেছে। এরমধ্যে বেশিরভাগ টাকাই খরচ হয়েছে মেশিন স্থাপন, সার্ভার ও পার্সোনালাইজেশনে। অর্থাৎ মূল অবকাঠামো তৈরিতে। এখন একটি কার্ড তৈরি করতে শুধু ১৭২ টাকা হলেই চলবে। যেই কার্ড দিয়ে দেশের সকল সুবিধা একিভূত করা সম্ভব। কিন্তু সেটা না করে পেছনে হাঁটছে সরকার। নতুন কার্ডের ধারণা সামনে নিয়ে আসছে। এতে একজন নাগরিকের পকেট কার্ডের ভারে ভারাক্রান্ত হবে যেমন। তেমনি প্রতিটি কার্ড আলাদা করতে গিয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হবে জনগণ। খরচ হবে অর্থ, বয় হবে সময়। অথচ চাইলে শুধু এক স্মার্ট কার্ড দিয়েই এসব সুবিধাকে এক জায়গায় নিয়ে আসা যেতো। এতে দেশের খরচ এবং সময় দুটোই বেঁচে যেতো।
স্মার্ট কার্ড এর প্রকল্প আইডিইএ-২ এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী দি ইনসাইটাকে বলেন, এটা একটা পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়। কার্ড প্রস্তুত আছে। এখন ডিজিটালাইজেশনের যে সুবিধাটা, সেটা দেয়া এবং নেয়াটা হচ্ছে টু-ওয়ে জার্নি। কোনো ব্যাংক যদি আমাদেরকে বলে যে আমরা আপনাদের এই সার্ভিসটা নিতে চাই, ওই ব্যাংকের নিজেদের একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি বলেন, মেট্রোরেলের জন্য আলাদা কার্ডের কোনো প্রয়োজন নেই। স্মার্ট এনআইডি কার্ডে যেই চিপ আছে, সেটা দিয়ে মেট্রোরেলের টিকিটও সম্ভব। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও স্মার্ট কার্ড কাজে লাগানো যাবে। সেই প্রযুক্তি এর মধ্যে দেয়া আছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্যও আলাদা কার্ডের প্রয়োজন কেন হবে? স্মার্ট কার্ডের চিপ দিয়ে বুথ থেকে টাকা ওঠানো সম্ভব। একজন নাগরিককে অনেকগুলো কার্ড কিংবা অনেকগেুলো নাম্বার বহন করা লাগবে না। এই একটি ইউনিক নাম্বারের মধ্যে তার যাবতীয় সুযোগ সুবিধা অন্তর্ভূক্ত করে দেয়া যায়। ড্র্রাইভিং লাইসেন্স থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য বিমা- দেশের এমন কোনো সেবাখাত নেই, সেটা এই স্মার্ট কার্ডের আওতাভুক্ত করা যাবে না। শুধু প্রয়োজন মন্ত্রণলায়গুলোর মানসিকতার। এখন প্রশ্ন হলো- তারা এরমধ্যে আসবে নাকি আলাদা আলাদা কার্ড করবে?
আইডিইএ-২ এর প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, চিপের মধ্যে তো ডেটা আছেই। এখন এটা মূলত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মন-মানসিকতার ব্যাপার। মানসিকভাবে আপনি মেনে নিতে পারছেন কি না? তিনি বলেন, যে সংস্কৃতি গড়ে উঠছে- সবাই চায় আলাদা আলাদা নিজেদের সাইলো (Silo) তৈরি করতে। এই সাইলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সেন্ট্রালাইজড চিন্তা করতে হবে। আপনার কোনো কার্ডেরই প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশে আপনার কার্ড থাকবে একটা এবং এভরিথিং ইজ পসিবল উইথ দ্যাট কার্ড। অলরেডি আমাদের সেই কার্ড আছে।
উল্লেখ, ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের ভোটার তালিকা ছিল সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল ও ত্রুটিপূর্ণ। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ কাগজে হাতে লিখে ভোটারদের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতেন। কোনো ছবি বা আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) না থাকায় একই ব্যক্তি একাধিক জায়গায় ভোটার হওয়া কিংবা মৃত ও কাল্পনিক মানুষের নামে লক্ষ লক্ষ ভিউ ভোটার তৈরি হওয়ার মতো ব্যাপক জালিয়াতির সুযোগ ছিল। তখন নাগরিকদের কোনো স্থায়ী পরিচয়পত্র বা এনআইডি ছিল না। নির্বাচনের দিন কেবল একটি সাধারণ কাগজের ভোটার স্লিপ দেয়া হতো। যার ফলে ছবিহীন ও প্রযুক্তিহীন কাগজের তালিকাটি সহজেই টেম্পারিং করা যেত। এটি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করত।
পরে এক-এগারোর সরকার ছবি ও আঙুলের ছাপসহ ভোটার আইডি কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেয়। ২০০৭ সালে একটি নির্ভুল ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ উদ্যোগে প্রক্রিয়াটির সূচনা হয়। ২০০৮ সালে এসে সেই কার্ডকে ভোটার কার্ড না বলে “জাতীয় পরিচয়পত্র” হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। প্রায় ৮ কোটি নাগরিককে কাগজের তৈরি ল্যামিনেটিং করা জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। একসময় এই কার্ডটিই নাগরিক সব কাজের মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠে। পরবর্তীতে ২০১০ সালে আইনি ভিত্তি পেয়ে নাগরিক সেবাগুলোর জন্য এটি বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। দেশে কমে আসে অপরাধের পরিমাণ। বন্ধ হয়ে যায় নামে-বেনামে মোবাইল সিম, ব্যাংক একাউন্টসহ অনেক জালিয়াত।
কিন্তু তখনো আলাদা আলাদা কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা নেয়া হতো। যেমন- ড্রাইভিং লাইসেন্স, বীমা কার্ড, ভাতা কার্ড ইত্যাদি। ২০১১ সালে এসে উদ্যোগ নেয়া হলো- সবগুলো সুবিধা একটি কার্ডের মধ্যে নিয়ে আসা হবে। একজন নাগরিকের আর কোনো কার্ড থাকবে না। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘আইডিইএ’ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে কার্ডের জালিয়াতি রোধ ও আধুনিকায়নের কাজ শুরু করে তৎকালীন নির্বাচন কমিশন। যার ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালে ২৫৬ কেবি চিপ ও বায়োমেট্রিক তথ্য-সম্বলিত আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক ‘স্মার্ট কার্ড’ বিতরণ শুরু হয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের উন্নত সংস্করণ স্মার্ট কার্ড (Smart NID Card) সাধারণ কাগজের লেমিনেটিং করা কার্ডের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক, নিরাপদ এবং কার্যকর। এতে নাগরিকের ১০ আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। ফলে কার্ডটি নকল করা বা তথ্য জালিয়াতি করা একেবারেই অসম্ভব। কার্ডের ডিজাইনে ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাম এবং বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা কালি (OVI) ব্যবহার করা হয়েছে। যা খালি চোখে বা সাধারণ আলোতে ভিন্ন ভিন্ন রঙে দৃশ্যমান হয়। কার্ডে ছবি এবং স্বাক্ষর লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে খোদাই করে বসানো হয়। যা কোনোভাবেই মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। স্মার্ট কার্ডটি শতভাগ পলিকার্বোনেট (Polycarbonate) উপাদান দিয়ে তৈরি। এটি সহজে ভেঙে যায় না। পানিতে নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহারের উপযোগী।
প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে স্মার্ট কার্ডে নাগরিকদের ২৫টিরও বেশি ধরনের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা হবে। চিপ ও বারকোড রিডারের মাধ্যমে মুহূর্তেই নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করা যাবে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং ঋণ আবেদন, পাসপোর্ট তৈরি ও নবায়ন, মোবাইল সিম কার্ড রেজিস্ট্রেশন (বায়োমেট্রিক যাচাই), সরকারি ও বেসরকারি চাকরি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তি, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা এবং রেজিস্ট্রেশন, টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট ও আয়কর রিটার্ন দাখিল, সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ভাতার সুবিধা সবই এই কার্ডের অধীনে নিয়ে আসা হবে।
অথচ ২০০৮ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ল্যামিনেটিং করা জাতীয় পরিচয়পত্র যে পর্যন্ত ব্যবহার করা হতো, স্মার্ট কার্ডের ব্যবহারও সেই একই জায়গায় আটকে আছে। তাহলে স্মার্ট কার্ডের পেছনে যে হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়ে গেছে, তার ফলাফল কি? স্মার্টের কার্ডের বহুবিধ ব্যবহারের যে সুযোগ রয়েছে, সেটা এড়িয়ে গিয়ে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে আবার কেন নতুন নতুন কার্ড উদ্ভাবন করছে? যেখানে চাইলেই এই একটি কার্ডের মধ্যে সব সুবিধা অন্তর্ভূক্ত করে ফেলা যেতো।
স্মার্ট কার্ড তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল- এই একটি কার্ড রিডারে পাঞ্চ করলেই একজন নাগরিকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট, ট্যাক্স প্রোফাইল, ব্যাংক হিসাব ও স্বাস্থ্য ইতিহাস মুহূর্তের মধ্যে চলে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের এই কার্ডটি বর্তমানে সাধারণ কাগজের লেমিনেটিং করা এনআইডির চেয়ে বেশি কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। কার্ডের ভেতরের চিপটি ব্যবহারের জন্য যে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো বা রিডার মেশিন প্রয়োজন, তা সরকারের কোনো সংস্থাই গড়ে তোলেনি।
এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশের একজন প্রযুক্তিবিদ, থ্রাইভিং স্কিলস লিমিটেড প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ এর সাথে। যিনি একইসাথে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, আমাদের স্মার্ট এনআইডিতে থাকা মেশিন রিডেবল চিপটির আসল কারিগরি ক্ষমতা হলো- এটি একটি সেন্ট্রালাইজড ক্লাউড ডেটাবেসের সাথে যুক্ত হয়ে যেকোনো নাগরিক সেবার ‘ডিজিটাল চাবিকাঠি’ হিসেবে কাজ করতে পারে। আলাদা আলাদা ফ্যামিলি বা কৃষক কার্ডের পেছনে কোটি কোটি টাকা অপচয় করে ডেটা ট্র্যাকিংকে জটিল করার চেয়ে, বিদ্যমান স্মার্ট কার্ডের অধীনেই একটি সমন্বিত ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি এবং খানাভিত্তিক (Household) “Data Deduplication” অ্যালগরিদম ব্যবহার করা অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও কার্যকর। এই কারিগরি রূপরেখা বাস্তবায়ন করলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রস-রেফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ট্র্যাক করতে পারবে।
স্মার্ট কার্ডের এই বিশাল ডাটাবেজকে ব্যবহার না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও বিভিন্ন কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারেরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে নতুন নতুন কার্ড চালুর ধুম পড়েছে। যেমন টিসিবি কার্ড, ফামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, এলপিজি কার্ড ও কৃষি কার্ড। অথচ স্মার্ট কার্ডের ডাটাবেজ ব্যবহার করেই সহজে এই সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের সাথে আলাপ করে এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা এনআইডি উইংয়ের সাথে খাদ্য, স্বাস্থ্য বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো ডেটা-শেয়ারিং বা প্রযুক্তিগত সমন্বয় নেই। এক মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়ের ডেটাবেজ ব্যবহার করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভোগে। মাঠ পর্যায়ে স্মার্ট কার্ড রিড করার মতো ডিভাইস বা অনলাইন সিস্টেম নেই। ফলে কার্ডের চিপটি শুধু প্লাস্টিকের ভেতরেই বন্দি হয়ে আছে। এছাড়া নতুন কার্ড মানেই নতুন প্রকল্প, নতুন বাজেট এবং নতুন কেনাকাটা। প্রকল্প-সংস্কৃতির কারণে বিদ্যমান ব্যবস্থার আধুনিকায়নের চেয়ে নতুন কার্ড চালুর দিকেই আগ্রহ বেশি থাকে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ দি ইনসাইটাকে বলেন, একটা কার্ডের মধ্যে সবকিছু নিয়ে আসলে তো সবগুলো অপারেশন সবসময় সহজ হবে না। তখন ইন্টিগ্রেটেড সবগুলো মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ লাগবে। আমাদের এখনো এই বিষয়ে দুর্বলতা আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আলাদা আলাদা পরিচালিত হয়। তবে আদর্শগকভাবে যদি আমরা একটা কার্ড করতে পারি এবং ন্যাশনাল আইডি কার্ডের অধীনে সবগুলো সেবা অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, সেটা অবশ্যই ভালো হবে। কিন্তু ওই জায়গায় পৌঁছানোর আগে আমাদের তো বেসিকগুলো আগে পূরণ করতে হবে। সেজন্যই আগে আমরা আলাদা আলাদা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। তারপরে হয়তো একটা সময় আমরা ওই জায়গায় পৌঁছাবো। যখন সবকিছু ডিজিটাল হয়ে যাবে। কিন্তু আদর্শগতভাবে আমি এই মতামতের সাথে একমত যে, জনগণের ভোগান্তি লাঘব করে যদি সমস্ত সুবিধা একটিমাত্র কার্ডে সমন্বিত করা যায়, তবে তা একসময় অত্যন্ত সুবিধাজনক হবে। একই সাথে আমি এটাও মনে করি যে, সরকার বর্তমানে সুপরিকল্পিত পন্থায় সঠিক পথেই কাজ করছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল দেশ এস্তোনিয়ার মোট জনসংখ্যার ৯৯% নাগরিক তাদের একটি মাত্র ‘ই-আইডি’ (e-ID) দিয়ে ভোট দেয়া থেকে শুরু করে প্রেসক্রিপশন নেয়া, ট্যাক্স দেয়া এবং ব্যাংকিংয়ের সব কাজ করেন। সিঙ্গাপুরের ‘Singpass’ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘Emirates ID’ দিয়ে ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে চিকিৎসা—সব এক কার্ডেই সম্ভব। বাংলাদেশের স্মার্ট কার্ডের চিপ ও প্রযুক্তির সক্ষমতাও কিন্তু এস্তোনিয়া বা আমিরাতের চেয়ে কম নয়। কেবল সদিচ্ছা এবং কেন্দ্রীয় একটি ডাটা শেয়ারিং পলিসি থাকলে দেশের সব নাগরিক সুবিধা এক ছাতার নিচে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, এসব দেশও কিন্তু একবারে “অল ইন ওয়ান” কার্ডে আসে নাই। তারা একটা দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পরে একটা কার্ডে আসছে। আমাদের সরকারের ভাবনাটাও সেরকম।
অন্যদিকে প্রযুক্তিবিদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ মনে করেন, আলাদা আলাদা কার্ড দিলে একই পরিবারের সবগুলো কার্ড পাওয়ার সম্ভবনা আছে। এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় সেটাই হবে। তাতে দেখা গেলো- একই পরিবারে সবগুলো সুবিধা চলে আসলো, আরেকটি পরিবার কিছুই পাবে না। একটি কার্ড হলে চিহ্নিত করা যাবে- কোন পরিবার সুবিধা পাচ্ছে এবং কারা বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে মানুষের হস্তক্ষেপ বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্নদেরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। যা একই পরিবারে সুবিধা কুক্ষিগতকরণের পথ বন্ধ করে স্মার্ট কার্ড প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলছেন, যাকে ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হবে, তাকে কৃষক কার্ড নাও দেয়া হতে পারে। আবার যাকে কৃষক কার্ড দেয়া হবে, তিনি এলপিজি কার্ড কিংবা অন্য কার্ড নাও পেতে পারেন।
উল্লেখ্য, স্মার্ট দুটি প্রকল্পে বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রথমে আইডিএ-১ ছিল ১০২ মিলিয়ন ইউএস ডলারের প্রকল্প। যার অর্থ সহায়তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তখন স্মার্ট কার্ড তৈরির জন্য ফ্রান্সের ওবার্থু কোম্পানীর সাথে চুক্তি হয়েছিল। ১০টা মেশিন, পার্সোনালাইজেশন এবং ৭ কোটি ৭৩ লাখ কার্ড প্রিন্ট বাবদ ওবার্থুকে ৭৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিল পরিশোধ করা হয়। এরপেরে তাদের সাথে চুক্তি বাতিল করে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় নির্বাচন কমিশন। সেখানে কয়েক দফায প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ আইডিএ-২ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০৬ কোটি টাকা। যার মধ্যে ২৯ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে এরমধ্যে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি ৩৪ লাখ জনগণের হাতে পৌছে গেছে। প্রস্তুত হয়ে বিতরণের বাকি আছে আরো প্রায় দেড় কোটি কার্ড। দেশের সব জনগণের কাছে স্মার্ট কার্ড পৌছে দিতে আরো কয়েকবছর সময় লাগবে। এক্ষেত্রে বাকি প্রতি কার্ড সরকারের খরচ পড়বে ১৭২ টাকা করে।
এই এতো এতো আয়োজন, এতো অর্থ ব্যয়, সময় ব্যয়- সবই ভেস্তে যাবে, যদি এর ব্যবহার নিশ্চিত করা না যায়। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে স্মার্ট এনআইডি কার্ডের যাত্রা শুরু হয়েছে, সবগুলো নাগরিক সেবাকে এক কার্ডের অধীনে নিয়ে আসা- তা না করে ভিন্ন ভিন্ন কার্ডের প্রকল্প নিলে সময় এবং ব্যয়ের জটিলতা তৈরি হবে। ভোগান্তিতে পড়বে সাধারণ মানুষ। তৈরি হবে নানা ধরণের বিড়ম্বনা। সর্বোপরি স্মার্ট লার্ডের পেছনে যে এরইমধ্যে ১৫ বছর সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে, তা অপচয়ের খাতায় যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ আবার পেছনের দিকে হাঁটবে। এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।




