ক্ষমতার নৈকট্যে বিশৃঙ্খলার ফাঁদে জামায়াত
কাঠামোগত শৃঙ্খলা ও কট্টর আদর্শের জন্য পরিচিত এই দলটির অভ্যন্তরে তীব্র বিতর্কের ঝড়। বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে একটি বিশেষ তথ্য ও তদারকি সেল গঠনের প্রস্তাব উঠেছে।
ক্ষমতার কাছাকাছি এসে আদর্শ ও শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মারাত্মক অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। সংসদীয় রাজনীতিতে বড় জয়ের পরপরই দলটির সংসদ সদস্য ও তৃণমূল নেতাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অসচেতনতা প্রকাশ্যে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনগণ আদর্শিক দলগুলোকে অন্য সাধারণ দলগুলোর চেয়ে বেশি নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করে। ফলে তাদের ছোটখাটো ভুলও চরমভাবে সমালোচিত হয়। এ সংকট কাটাতে দলের অভ্যন্তরে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠলেও শীর্ষ নেতৃত্ব তা উপেক্ষা করছেন।
Bangladesh Jamaat-e-Islami, known for its ideology and discipline, is facing a serious internal crisis after coming close to power. Immediately after its big victory in parliamentary politics, the immoral activities and ignorance of the party’s MPs and grassroots leaders are coming to light. According to political analysts, the public judges ideological parties with higher moral standards than other ordinary parties. As a result, even their minor mistakes are severely criticized. Although proposals for structural changes within the party have been made to overcome this crisis, the top leadership is ignoring them.
ক্ষমতার নৈকট্য ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ সংকট চরমে উঠেছে। যত বেশি দলটি ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাচ্ছে, ততই দলীয় নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যদের নানা অনিয়ম, আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ফলে কাঠামোগত শৃঙ্খলা ও কট্টর আদর্শের জন্য পরিচিত এই দলটির ভেতরেই এখন বইছে তীব্র বিতর্কের ঝড়। সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক পদস্থলন জড়িত কর্মকাণ্ডে আরো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে দলটি। দলের ভেতরের অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে জামায়াতে ইসলামীর নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একটি বিশেষ তথ্য ও তদারকি সেল গঠনের বিষয়ে প্রস্তাব উঠেছে। যদিও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ দি ইনসাইটাকে বলেন, এসব ঘটনা কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা নয়। বরং ব্যক্তির তাকওয়া, ঈমানি দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিকতার ঘাটতির ফল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামীর জন্য ২০২৬ সাল একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে দলটির সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে এই নির্বাচনে। ৩১.৭৭% ভোট পেয়ে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে দলটি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর আগে ১৯৯১ সালে দলটির সর্বোচ্চ ভোট ছিল ১২.২% এবং ২০০১ সালে জোটগত সমীকরণে ১৭টি আসন পেয়েছিল তারা। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার নাগালের বাইরে থাকা দলটি এখন দেশের রাজনীতির মূলধারায়। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি। আর ক্ষমতার কাছাকাছি আসতেই নানা বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে জামায়াতকে।
সম্প্রতি জামায়াতের সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন স্তরের নেতাদের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দলটিকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একটি বিতর্কিত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেলে তীব্র অস্বস্তিতে পড়ে জামায়াত। প্রথমে দলটির সমর্থকশ্রেণী ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি দাবি করে। পরে দ্বিতীয় স্ত্রীর বিতর্কিত চুক্তিপত্র প্রকাশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাকরি সংক্রান্ত নথিতে মিথ্যা সুপারিশের তথ্য সামনে আসে। পরবর্তীতে দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারায় তাকে বহিষ্কার করা হয়।
এর আগে নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজের পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা থাকার বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য পরিবেশন করেন। সংসদে দাঁড়িয়ে আব্দুল মুনতাকিম দাবি করেন- তার বাবা এবং দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। তার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। যদিও আব্দুল মুনতাকিম তার নির্বাচনী হলফনামায় জন্ম তারিখ উল্লেখ করেছেন ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ১০ জানুয়ারি। ১৯৭১ সালে তার বাবা শহীদ হলে ১৯৮১ সালে তিনি জন্ম নিলেন? এটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে সংসদের কার্যবিবরণী থেকে আব্দুল মুনতাকিমের বক্তব্য বাদ দেয়া হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান বাজেট আলোচনার সময় সরকারি ফ্ল্যাটে ওভেন ও ওয়াশিং মেশিন সরবরাহের দাবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে হাস্যরসের শিকার হন। রংপুর-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমিন টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের সরকারি বরাদ্দ নিজ ভগ্নিপতি ও ভাগনের নামে বণ্টন করে চরম স্বজনপ্রীতির জন্ম দেন। অন্যদিকে নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমানের মেয়ের নাম দরিদ্রদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। দলটির আরেক সংসদ সদস্য মুফতি আমীর হামজাকে নিয়ে সব সময় বিতর্ক লেগেই থাকে।
এছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। ঝিনাইদহরে কোটচাঁদপুরে সরকারি বাইসাইকেল ও মালামাল ভাগাভাগি জালিয়াতি, সাতক্ষীরার তালা ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জমি দখল চেষ্টার অভিযোগও ওঠে। এমনকি যশোরের মণিরামপুরে নদী খননের মাটি বিক্রির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সশস্ত্র সংঘাতে জড়ায় জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। দেশের আরো নানা স্থান থেকে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠছে। জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত এখন নানা গ্রুপিংও চলছে। সবমিলিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা দলটির বেহলা অবস্থা।
দলের ভেতরের অনিয়ম ও এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে একটি আলোচনা উঠেছে। তা হলো- একটি বিশেষ অভ্যন্তরীণ তদারকি ও তথ্য সেল গঠন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের এক পলিসি অ্যাডভাইজার দি ইনসাইটাকে জানান, জামায়াত আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল হওয়ায় একজন নেতার রাজনৈতিক ও নৈতিক পতন পুরো দলের ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। তিনি বলেন- “প্রতিটি নেতা ও কর্মীর নৈতিক পদস্খলন বা বহিরাগত সন্দেহজনক উপাদানের নিয়ন্ত্রণে একটি স্বাধীন তদারকি ও তথ্য সেল দরকার। না হলে প্রতিপক্ষের তৈরি হানিট্র্যাপ কিংবা এজেন্সির নানা ফাঁদে পড়ে দলের চরম ক্ষতি হতে পারে।”
যদিও নতুন কোনো নীতি বা উদ্যোগের সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, এসব ঘটনা কোনো কাঠামোগত দুর্বলতা নয়, বরং ব্যক্তির তাকওয়া, ঈমানি দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিকতার ঘাটতির ফল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “মানুষ হিসেবে ব্যক্তিগত বিচ্যুতি অসম্ভব নয়, কিন্তু জামায়াত কখনোই কোনো অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় না। পূর্বেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, বর্তমানেও তা বজায় আছে।”
তবে এই ব্যাখ্যার উল্টো চিত্র তুলে ধরেছেন জামায়াতের এক নারী নেত্রী। নাম গোপন রাখার শর্তে তিনি অভিযোগ করেন, দলে বর্তমানে লেনদেন সংক্রান্ত অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রচুর। কঠোর শাস্তির বদলে অনেক ঘটনা চেপে যাওয়া হচ্ছে বা ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে এবং নারীদের মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে সামান্য অভিযোগে তদন্ত হতো। রুকনিয়াত (সদস্য) বাতিল করা হতো। এখন অনেক অভিযুক্তের রুকনিয়ত বহাল আছে। দল যদি এভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তবে রাষ্ট্র চালাবে কীভাবে?”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের ওই পলিসি অ্যাডভাইজার আরো বলেন, জামায়াতের এবার অনেক নতুন সংসদ সদস্য রয়েছেন, বিশেষ করে যারা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসেছেন। হঠাৎ করেই জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ও ক্ষমতার লাইমলাইটে এখন তারা। তাদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হয়। দেশি-বিদেশি প্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সাথে হয়। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের ঘাটতি, সার্বিক অসচেতনতা এবং অনভিজ্ঞতার কারণে নানা ধরনের বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে জামায়াতের অনেক এমপিদের অসচেতন কথাবার্তা এবং চলাফেরা প্রায়ই বড় ধরনের বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে দলটির জন্য। ঘরোয়া কোনো পরিবেশ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈঠক বা ব্যক্তিগত আলোচনায় তারা যা বলছেন, তা হয়তো নিজেদের লোক ভেবেই বলছেন। কিন্তু দলের কর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ সেই সব কথা গোপনে বা প্রকাশ্যে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কোথায় কী বলতে হবে, কোন জায়গায় কেমন আচরণ করতে হবে, সেই ব্যাপারে জানাশোনার ঘাটতি আছে অনেকেরই।
তিনি বলেন, আমি দেখেছি- জামায়াতের এমপিরা ঠিকভাবে মোবাইল ফোনটাও ব্যবহার করতে পারে না। লোভনীয় কোনো প্রলোভন বা জরুরি বার্তার অজুহাতে আসা ফিশিং ইমেইলের লিংকে ক্লিক করে অনেকেই অফিশিয়াল ইমেইল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়ে যাচ্ছেন। এআই প্রযুক্তির বিষয়েও তাদের তেমন কোনো জ্ঞান নেই। তারা যে গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকেন, এই বিষয়টি কেন জানি তাদের বোধই হয় না। ব্যাক্তিগত নিরাপত্তা বা চলাফেরার ব্যাপারেও তারা খুবই অসেচতন। এই পরিস্থিতি উত্তরণে ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা সচেতন থাকার জন্য কোনো প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা দলের মধ্যে নেই।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের আয়োজিত এক কর্মসূচিতে গিযে মোবাইল ফোন খুইয়েছেন ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমান। ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ সম্প্রচার করবে বলে ব্যারিস্টার আরমানের কাছে উপস্থিত এক ব্যক্তি মোবাইল ফোনটি চান। তিনি কোনো যাচাই বাছাই না করেই অপরিচিত ওই লোকটির হাতে মোবাইল দিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর লাইভ চলা অবস্থাতেই ওই ব্যক্তি ফোনটি নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। পরে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। একইভাবে মোবাইল ফোন হারিয়েছেন দলটির আরেকজন সংসদ সদস্য ও নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। এসব ঘটনায় বিষ্ময় প্রকাশ করে অনেকেই বলেছেন, যারা নিজের হাতের ফোনটি সংরক্ষণ করতে পারে না- তারা রাষ্ট্রকে কিভাবে হেফাজত করবে?
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে জামায়াত বিট কাভার করা সমকালের বিশেষ প্রতিবেদক রাজীব আহম্মদ জামায়াতের বর্মতান পরিস্থিতিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তুবিন্যাসের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। দি ইনসাইটাকে তিনি বলেন, জামায়াত আগে ছোট গণ্ডির দল ছিল, তাই নজরদারির বাইরে ছিল। এখন প্রধান বিরোধী দল হিসেবে তারা জনসাধারণের তীব্র নজরদারি মুখোমুখি। ফলে তাদের অনেক ছোটো ভুল নিয়েও তুলকালাম ঘটে যায়।
তিনি বলেন, শক্তিশালী উপজেলাগুলোতেও জামায়াতের রুকন সংখ্যা সাধারণত ১০০ থেকে ৭৫০ জন। কিন্তু নির্বাচন সামলাতে গিয়ে ১০-১২ হাজার সাধারণ সমর্থক ও নতুনদের ভেড়াতে হয়েছে। ফলে তৃণমূলের নতুন এসব সমর্থকের অপকর্মের দায়ভার দলকেই নিতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, জামায়াতের ভেতরে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর কারণে যেকোনো অন্যায় বা অপরাধের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় না। তদন্ত কমিটি, রিপোর্ট পেশ, নির্বাহী পরিষদের অনুমোদন হয়ে আমীরের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এর বাইরে জামায়াত নিজেদের সাধারণ দলগুলোর চেয়ে “এক ধাপ উন্নত” দাবি করে রাজনীতি করে। তাই নতুনদের সুশৃঙ্খল রাখতে না পারলে জনগণ ও সমর্থকরা তাদের থেকে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আদর্শিক বা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণ সাধারণ ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে বেশি কঠোর নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করে। এতদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা জামায়াতের নেতাকর্মীরা হঠাৎ ক্ষমতার কাঠামোগত স্বাদ পেতে শুরু করায় তাদের মধ্যকার সুবিধাবাদী প্রবৃত্তি জেগে উঠেছে। বিএনপির মতো দলগুলোর অভিজ্ঞতা ও খাপ খাওয়ানোর যে সক্ষমতা আছে, জামায়াতের মতো আদর্শিক দলের জন্য তা সামলানো সহজ নয়।
তিনি বলেন, ধর্ম ও নৈতিকতার রাজনীতি করার কারণে তাদের আদর্শ ও ধর্মীয় আচার-আচরণকে মানুষ অনেক গভীর বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার কেন্দ্রে রাখে। কিন্তু ইসলামী বা আদর্শিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা সাধারণ মানুষের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন প্রকৃতির নন। জামায়াত তাদের দলকে যেভাবে নিখুঁত বা নির্ভেজাল হিসেবে উপস্থাপন করে, বাস্তবে কোনো নেতাকর্মী সামান্য শরিয়াহ-বিরোধী বা দুর্নীতিমূলক কাজে জড়িয়ে পড়লেই দলের ভেতরে বড় ধরনের সংকট ও জনমনে ভাবমূর্তির ধস নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মীর্জা গালিব দি ইনসাইটাকে বলেন, ক্ষমতার প্রভাবে এই সমস্যাগুলো আরও বাড়বে। দলকে নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রশ্নে পুরোপুরি আপসহীন হতে হবে। অপরাধের প্রমাণ মিললেই রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের স্পষ্ট বার্তা থাকলে কর্মীরা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জামায়াতকে আরও বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তার মতে, বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতা এলে আদর্শিক বা বুর্জোয়া—সব দলেই চরম বিপর্যয় ঘটে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “জামায়াতের নিয়ন্ত্রণাধীন একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও দ্বন্দ্বে প্রায়ই দলীয় বিচার-শালিস করতে হয়। জামায়াত যখন প্রচলিত ব্যবস্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার আপসকামিতা দেখাবে এবং ইসলামী শরীয়াহর নীতিতে নমনীয় হবে, তখন তাদের মৌলিক সমর্থক-ভোটব্যাংকের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। আদর্শবিচ্যুতির অভিযোগ তুলে দলের ভেতরেই বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অবশ্য দাবি করেছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার জন্য ইতিমধ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।



