বাজেট ২০২৬-২৭: সামষ্টিক অর্থনীতির গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস
বাজেট ২০২৬-২৭ কি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে, নাকি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে? ভর্তুকি কমানো, ঋণের সুদ বৃদ্ধি ও করের চাপ বিশ্লেষণ করলে কী বোঝা যায়? কার স্বার্থ রক্ষা করছে এই বাজেট?
Bangladesh’s proposed 2026–27 budget promises fiscal discipline and economic reform, but at what cost? This analysis examines rising debt payments, subsidy cuts, indirect taxation, and development priorities, arguing that the burden of adjustment is increasingly being shifted onto ordinary citizens.
একটি রাষ্ট্রের বাজেট কেবল কিছু গাণিতিক সংখ্যার যোগ-বিয়োগ বা বার্ষিক আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়; এটি মূলত আগামী ৩৬৫ দিন দেশের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক কীভাবে জীবনধারণ করবেন, তার এক অঘোষিত নিয়তিপত্র। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামোর তুলনামূলক ম্যাট্রিক্স বিশ্লেষণ করলে সামষ্টিক অর্থনীতির যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বস্তির বার্তা বহন করছে না। বরং তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক সংস্কার’ ও ‘অকৃচ্ছ্রতা’র আড়ালে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের কাঁধে এক নির্মম অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী নকশা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির তীব্র কষাঘাতে সাধারণ মানুষের পিঠ যখন ইতোমধ্যে দেয়ালে ঠেকে গেছে, তখন নতুন বাজেটের নীতি-নির্ধারণী চালিকাশক্তি সাধারণ ভোক্তাকে আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলেছে। “বাজেট ২০২৬-২৭ এর প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সরকারের সামগ্রিক ব্যয় বণ্টনে একটি কাঠামোগত বৈষম্য প্রকট। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর প্রেসক্রিপশন ও শর্তপূরণের অন্ধ মোহ যে দেশের সাধারণ জনগণকে কতটা শোচনীয় অবস্থায় ফেলতে পারে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ভর্তুকি ও প্রণোদনা (Subsidies and Incentives) খাতে নজিরবিহীন বরাদ্দ কর্তন।
ঘাটতি অর্থায়নের ফাঁদ
যেহেতু দেশের ভেতরের রাজস্ব ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল, তাই জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত ১০০ টাকার কর সরাসরি ১০০ টাকার সরকারি ব্যয়ে রূপান্তরিত হতে পারে না। ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ ঋণের আশ্রয় নিতে হয়। যদি আমরা সাম্প্রতিক বাজেট কাঠামোর দিকে তাকাই, তবে দেখব মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ৫৭ বিলিয়ন ডলার (যার মধ্যে এনবিআর-এর লক্ষ্যমাত্রা ৫০ বিলিয়ন ডলার), সেখানে পরিকল্পিত ব্যয়ের আকার ৭৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে শুরুতেই ১৯ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল বাজেট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যা মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বিদেশি ঋণদাতাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত প্রতি ১০০ টাকার কর ও অভ্যন্তরীণ রাজস্বের বিপরীতে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে আরও ৩৩.৩৩ টাকা ঋণ নেয়। তবেই সরকারের মোট ব্যয় করার ক্ষমতা ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৩.৩৩ টাকায় পৌঁছায়। উল্টোভাবে বললে, সরকারের খরচ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৭৫ টাকা আসে জনগণের কর থেকে, আর বাকি ২৫ টাকাই হলো নতুন করে নেওয়া ঋণের বোঝা।
সাময়িকভাবে এই ধার-দেনার টাকা দিয়ে বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বা ক্যাপিটাল প্রজেক্টের চাকচিক্য দেখানো গেলেও, এটি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ঋণকে এক বিপজ্জনক স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। যার মাশুল হিসেবে ভবিষ্যতের করের টাকার একটি বড় অংশ জনসেবায় ব্যয় না হয়ে চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধে।
১০০ টাকা বাজেটের তুলনামূলক বরাদ্দ ও নিট পরিবর্তন (অর্থবছর ২৫-২৬ বনাম অর্থবছর ২৬-২৭)
সুদ পরিশোধ (Interest Payments) গত অর্থবছরে ছিল ২২.৪ টাকা, এই অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.২ টাকা। (নিট বৃদ্ধি: +১.৮ টাকা)
ভর্তুকি ও প্রণোদনা (Subsidies and Incentives) গত অর্থবছরে ছিল ১৯.১ টাকা, এই অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১৬.৫ টাকা। (নিট হ্রাস: -২.৬ টাকা)
বেতন ও ভাতা (Salaries & Allowances) গত অর্থবছরে ছিল ১৫.৫ টাকা, এই অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬.৮ টাকা। (নিট বৃদ্ধি: +১.৩ টাকা)
পণ্য ও সেবা (Goods & Services) গত অর্থবছরে ছিল ৯.৪ টাকা, এই অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৮ টাকা। (নিট হ্রাস: -০.৬ টাকা)
উপরিউক্ত ডেটা থেকে স্পষ্ট যে, গত অর্থবছরে (অর্থবছর ২৫-২৬) যেখানে প্রতি ১০০ টাকার বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৯.১ টাকা, তা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এক ধাক্কায় কমিয়ে ১৬.৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিট হ্রাস ঘটেছে ২.৬ টাকা। নীতিগত চালিকাশক্তি হিসেবে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে—”বিদ্যুৎ খাতের ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং আইএমএফ-এর শর্তানুযায়ী জ্বালানি ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ”। যখন রাষ্ট্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ওপর থেকে তার হাত গুটিয়ে নেয়, তখন তার চেইন-ইফেক্ট বা বহুমাত্রিক প্রভাব গিয়ে পড়ে কৃষি সেচ, গণপরিবহন এবং শিল্প উৎপাদনে। এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ বাজারে দিনমজুরি করা বা সীমিত আয়ের মানুষকে।
অথচ, এই ভর্তুকি কমানোর বিপরীতে রাষ্ট্রের অনুৎপাদনশীল বা দায়বদ্ধ খাতের ব্যয় কিন্তু জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই চলে যায় অনুৎপাদনশীল বা পরিচালন ব্যয়ে (Operating Expenditures)। এই অনুৎপাদনশীল ব্যয়ের সিংহভাগই গিলে খাচ্ছে দুটি খাত—জনপ্রশাসন এবং ঋণের সুদ পরিশোধ।
বাজেটের সবচেয়ে বড় রাক্ষুসে খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ঋণের সুদ পরিশোধ’ (Interest Payments)। সুদ পরিশোধের ব্যয় ২২.৪ টাকা থেকে বেড়ে ২৪.২ টাকা হয়েছে, যা বাজেটের একক বৃহত্তম খাত এবং নিট বৃদ্ধি +১.৮ টাকা। এর অর্থ হলো, সরকার অতীতে যে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি ঋণ নিয়েছে, তার সুদ মেটাতেই এখন বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৪.২%) অর্থ উবে যাচ্ছে। যে অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার হতে পারত, তা চলে যাচ্ছে ঋণদাতাদের পকেটে। এটি মূলত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ত্রুটিপূর্ণ সামষ্টিক ঋণ ব্যবস্থাপনারই চরম বহিঃপ্রকাশ।
পাশাপাশি, জনপ্রশাসন খাতে ব্যয় হচ্ছে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ২৪.০০ টাকা। আমলাতন্ত্রের এই বিশাল খরচ মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চড়া বেতন ও পেনশন বৃদ্ধির কারণে তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল অর্থ খরচ করার পরেও সরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা বা নাগরিক সেবার মান বিন্দুমাত্র বাড়েনি। ব্যাংক খাতের সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি যে বিশাল খেলাপি ঋণ, তার ফলে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং সরকারকে চড়া সুদে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ছেড়ে ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে। ফলে করের টাকা সরাসরি চলে যাচ্ছে ঋণদাতাদের পকেটে, আর আমজনতা বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকার থেকে।
আরেকটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিক ফুটে ওঠে সরকারি খাতের ব্যয় বিন্যাসে। তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় যখন বেসরকারি খাতের কোটি কোটি মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছেন কিংবা স্থবির বেতনের কারণে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন, তখন রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-कर्मচারীদের বেতন ও ভাতা (Salaries and Allowances) খাতে বরাদ্দ ১৫.৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬.৮ টাকা (+১.৩ টাকা) করা হয়েছে। একই সাথে পেনশন খাতেও বরাদ্দ বেড়েছে (+০.৩ টাকা)। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—দেশের মাত্র কয়েক শতাংশ সরকারি কর্মজীবীর সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষায় রাষ্ট্র যতটা তৎপর, অবশিষ্টাংশ সাধারণ জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ায় রাষ্ট্র ততটাই উদাসীন কেন? সাধারণ মানুষের করের টাকায় একটি নির্দিষ্ট সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর পকেট ভারী করার এই নীতি কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে না।
শিক্ষা খাতে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ থেকে মুক্তির চেষ্টা
শিক্ষা খাতে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ১৫.০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশের সমান। বিগত বছরগুলোর (FY24-এ ১.৭৬%, FY25-এ ১.৬৯%) তুলনায় এটি কিছুটা বেশি মনে হতে পারে।
অতীতে শিক্ষা বাজেটের মধ্যে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ কিংবা বড় বড় মেগা প্রজেক্টের (যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা আইসিটি অবকাঠামো) খরচ ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। অর্থনীতিবিদরা একে বলতেন ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। এর মাধ্যমে শিক্ষা বাজেটকে কাগজে-কলমে বড় করে দেখানো হলেও, আসল স্কুল, খাতা-কলম বা শিক্ষকদের পেছনে বিনিয়োগ আড়ালেই থেকে যেত। বর্তমান বাজেটে এই দুটি খাতকে আলাদা করায় অন্তত শিক্ষা খাতের প্রকৃত বরাদ্দের একটি স্বচ্ছ চিত্র সামনে এসেছে। এই টাকা এখন শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি, ঝরে পড়া রোধে উপবৃত্তি এবং গ্রামীণ স্কুলের উন্নয়নে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে পকেটের ধকল ও ‘ব্লক বরাদ্দ’-এর রাজনীতি
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মাত্র ৫.০০ টাকা, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এর ওপর আবার বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়ন করার চরম অক্ষমতা ও আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি। প্রতি বছরই দেখা যায়, কেনাকাটার জটিলতা ও অদক্ষতার কারণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেটের একটি বড় অংশ (কখনও কখনও ৭৪% পর্যন্ত) কাটছাঁট করতে হয়।
এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) বিশাল অঙ্কের অর্থ ‘ব্লক বরাদ্দ’ বা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। যেমন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগকে দেওয়া হয়েছে ২০৮ বিলিয়ন টাকার ব্লক বরাদ্দ। এই নমনীয় তহবিল দিয়ে দ্রুত ১ লক্ষ ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং গ্রামীণ ক্লিনিক সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে, এই ধরণের বড় ব্লক বরাদ্দ জবাবদিহিতা কমায় এবং এর ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বা আর্থিক দুর্নীতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ভর্তুকির ফাঁদে উন্নয়ন জিম্মি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে
জ্বালানি খাতে প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে মাত্র ৩.০০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই খাতটি এখন সরকারের জন্য এক গলার কাঁটা। কাতার বা ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় সরকারকে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার (Spot Market) থেকে প্রায় আড়াই গুণ বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই বিশাল ভর্তুকির টাকা জোগাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের মূল উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করতে হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন কোনো আধুনিক গ্রিড লাইফ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো তৈরি না করে, স্রেফ জোড়াতালি দিয়ে বর্তমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু রাখতেই করের টাকা ভর্তুকি হিসেবে গিলে খাচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও জলবায়ু তহবিলের ঘাটতি
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হচ্ছে মাত্র ৬.০০ টাকা। তীব্র খাদ্য মূল্যস্ফীতির এই সময়ে ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি বাড়িয়ে ৪১ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনা হয়েছে। তবে এই টাকা যাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় বা ভুয়া নামে চুরি না হয়, সেজন্য ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডিজিটাল ডেটাবেজ লিংক করার কাজ চলছে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশ হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম। যেখানে প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন, সেখানে মাত্র সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের মতো বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। দেশের রাজস্বের এই টানাপোড়েনের কারণে জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক অনুদানের আশায় ঝুলে আছে।
তাছাড়া, ‘পণ্য ও সেবা’ (Goods and Services) খাতে ব্যয় ৯.৪ টাকা থেকে কমিয়ে ৮.৮ টাকা (-০.৬ টাকা) করা হয়েছে, যাকে ‘প্রশাসনিক কৃচ্ছ্রসাধন’ বলে চালানো হচ্ছে। তবে场পর্যায়ের বাস্তবতা হলো, এই খাতটি সংকুচিত করার ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ ব্যাহত হবে, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দৈনন্দিন রক্ষণাবেক্ষণ থমকে যাবে। অর্থাৎ, তথাকথিত অস্টেরিটি বা কৃচ্ছ্রসাধনের কোপটি শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে জনগণের মৌলিক সেবা প্রাপ্তির জায়গাতেই।
নাগরিকের টাকার ব্যবচ্ছেদ — করের জুলুম ও কাঠামোগত ফাঁকি
বাংলাদেশের সরকারি কোষাগারের অন্যতম প্রধান সংকট হলো এর সংকীর্ণ রাজস্ব ভিত্তি। কর ও জিডিপির অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ৬.৫ থেকে ৭.৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন তো বটেই, উপরন্তু একটি রাষ্ট্রের মৌলিক জনসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ১৫ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। ফলে রাষ্ট্রের ব্যয়ভার বহনের পুরো দায় গিয়ে চাপছে মুষ্টিমেয় করদাতার ওপর এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকারকে প্রবলভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক ও পরোক্ষ করের ওপর।
নাগরিকের পকেট থেকে কেটে নেওয়া ‘প্রতি ১০০ টাকার কর’ আসলে কোথায় যাচ্ছে, তা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের দেখতে হবে দৈনন্দিন লেনদেনের আড়ালে কীভাবে এই অর্থ শুষে নেওয়া হচ্ছে এবং কোন পদ্ধতিগত ফাঁকফোকরের কারণে রাষ্ট্রের প্রকৃত কোষাগার শূন্যই থেকে যাচ্ছে।
নাগরিকের ব্যয়ের ওপর করের বোঝা ও বাস্তব চিত্র
মোবাইল রিচার্জ (পরোক্ষ করের ফাঁদ): আপনি যখন ১০০ টাকা মোবাইল রিচার্জ করেন, তখন তার সিংহভাগই চলে যায় করের পেটে। সম্পূরক শুল্ক (যা বাড়িয়ে ২৩% করা হয়েছে), ভ্যাট ও সারচার্জ বাবদ ২৯.৮০ টাকা; ন্যূনতম কর ও রাজস্ব ভাগাভাগি বাবদ ৬.১০ টাকা এবং অন্যান্য পরোক্ষ কর বাবদ ২০.৪০ টাকাসহ মোট ৫৬.৩০ টাকাই কেটে নেয় রাষ্ট্র। ফলে আপনার ১০০ টাকার রিচার্জের প্রকৃত ব্যবহারিক মূল্য দাঁড়ায় মাত্র ৪৩.৭০ টাকা। এটি সরাসরি নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ডিজিটাল সেবার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিনির দাম (আমদানি শুল্কের বোঝা): প্রতি কেজি চিনি আমদানিতে ৪২.০০ টাকারও বেশি সরাসরি আমদানি শুল্ক হিসেবে দিতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) আগ্রাসী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে এই নির্দিষ্ট কাস্টমস ডিউটি ও রেগুলেটরি ট্যারিফ বসানো হয়েছে। এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম বাড়িয়ে এক ধরণের নিষ্ঠুর ‘ভোগ কর’ হিসেবে কাজ করছে, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার ওপর সমানভাবে চেপে বসছে।
ভ্যাট আদায়ের ঘাটতি (পদ্ধতিগত ফাঁকি): বাজারে যে পরিমাণ ভ্যাট বা মূসক ওঠার কথা, তার মধ্যে ৩০.০০ থেকে ৪০.০০ টাকা পর্যন্ত আদায় না হয়ে মাঝপথেই হাওয়া হয়ে যায়। প্রাতিষ্ঠানিক কর ফাঁকি, স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রনিক ইনভয়েসিং সিস্টেমের অভাব এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতের কারণে এই ভ্যাট গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য রাজস্বের প্রায় ৪০% রাষ্ট্র পায় না এবং এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে অন্য পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক চাপাতে হয়।
খেলাপি ঋণের বোঝা: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৫.৭৩ টাকাই এখন খেলাপি ঋণের (NPL) খাতায়। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা ‘ঋণ লুটপাটের’ কারণে ব্যাংক খাত আজ খাদের কিনারে। এই বিপুল পরিমাণ টাকা আটকে থাকায় উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতের জন্য নতুন ঋণের তহবিল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বাজারের অদৃশ্য ‘মুদ্রাস্ফীতি কর’: গত বছরের ১০০ টাকার বাজার করতে এখন নাগরিকদের অতিরিক্ত ৮.২৯ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের ত্রুটি, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং লাগামহীন মুদ্রানীতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি মূলত একটি অদৃশ্য কর, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে প্রতিনিয়ত গ্রাস করছে।
এই চিত্রটি একটি চরম কাঠামোগত সংকটকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: যেখানে প্রত্যক্ষ আয়কর আদায়ের হার নগণ্য (১ কোটিরও বেশি টিআইএন ধারীর মধ্যে অর্ধেকেরও কম রিটার্ন জমা দেন), সেখানে রাষ্ট্র বাধ্য হয়ে যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর চড়া পরোক্ষ কর বসিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
এর ওপর আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আসে বিতর্কিত সব নীতিগত সিদ্ধান্ত—যেমন অপ্রদর্শিত ও পাচার হওয়া অর্থ বিনা শর্তে বৈধ করার সুযোগ বা কালো টাকা সাদা করার অ্যামনেস্টি। নাগরিক সমাজ ও অর্থনীতিবিদরা একে বরাবরই অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করেছেন। নামমাত্র করে এই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিয়ে আসলে সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় কর ফাঁকিকে এক ধরণের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে কাগজ-কলমে ভারসাম্যপূর্ণ দেখানোর একটি মরিয়া চেষ্টা মাত্র। আইএমএফ-এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে জনগণের পকেট থেকে ভর্তুকির সুবিধা কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অথচ সেই অর্থ সরাসরি অপচয় হচ্ছে ঋণের সুদ মেটাতে এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যয় নির্বাহে। এই জনবিচ্ছিন্ন বাজেট নীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধ্বংস করে এবং তাদের পেটে ক্ষুধা রেখে যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে, তা আসলে তাসের ঘরের মতো ভঙ্গুর। অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে সবার আগে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হবে, অন্যথায় এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিস্ফোরণ সুদূরপ্রসারী সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে।
লেখক পরিচিতি:
মো: আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, সহযোগী অধ্যাপক, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও, থ্রাইভিং স্কিলস লিমিটেড
Disclaimer: The views expressed in this article are the authors' own and do not necessarily reflect The Insighta's editorial stance. However, any errors in the stated facts or figures may be corrected if supported by verifiable evidence.



