লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত গ্রামীণ জীবন, শহরের তুলনায় বৈষম্য চরমে
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। গ্রামে টানা ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। শহরে নানা বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও গ্রাম ডুবছে অন্ধকারে, বণ্টনে বৈষম্য কেনো?
Amid a scorching August heat wave, Bangladesh is enduring one of its worst power crises in years. But if the country truly reached full electrification, why are villages now going dark for 10 to 16 hours a day while cities like Dhaka hold a steadier supply? When the power runs short, who gets to keep the lights on, and who is left behind?
আগস্টের প্রচণ্ড তাপদাহের মাঝে বাংলাদেশজুড়ে নেমে এসেছে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকট। বিগত এক দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে শতভাগ কভারেজের নানা দাবি সত্ত্বেও, ২০২৬ সালের আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে এ যাবৎকালের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামাঞ্চল, যেখানে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) চার কোটি গ্রাহক বসবাস করেন, সেখানে বিদ্যুৎ সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। গ্রামে টানা ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। তবে ভোগান্তি কেবল গ্রামেই সীমাবদ্ধ নেই। এতদিন অপেক্ষাকৃত স্বস্তিতে থাকা রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতেও ১২ আগস্ট রাত থেকে শুরু হয়েছে দফায় দফায় দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি সমিতির সম্মিলিত চাহিদা ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অঞ্চলভিত্তিক দৈনিক ঘাটতির চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলে চাহিদা ১,০৭২ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ ৭৩৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৩১ শতাংশ। নেত্রকোনায় ৭২–৭৯ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, কোথাও দিনে ১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে না। রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে গড় ঘাটতি ২৭ শতাংশ। রংপুর নগর ও গ্রামে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। খুলনা, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে গড় ঘাটতি ২৪ শতাংশ। বরিশালের কোনো কোনো গ্রামে দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। ঢাকা অঞ্চলে চাহিদা ৩,০০৪ মেগাওয়াট, সরবরাহ ২,১৫৯ মেগাওয়াওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ২৮ শতাংশ।
জাতীয় গ্রিডের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৩ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ৩ আগস্ট রাত ১টায় দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লোডশেডিং ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ৯ থেকে ১০ আগস্ট রাত ১টায় লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে ৩,৭৫৭ মেগাওয়াটে, যা দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ১১ আগস্ট ১৮,৯৭৫ মেগাওয়াটের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫,৮৩৩ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ঘাটতি ৩,১৪২ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নজিরবিহীন এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, কয়লার তীব্র সংকট।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হওয়া সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক ও ৫টি তেলভিত্তিকসহ মোট ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পটুয়াখালীর ১,৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন নেমে এসেছে ৮০০–১,০০০ মেগাওয়াটে এবং আদানির ১,৪০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে মিলছে মাত্র ১,০০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুত এই চরম দুর্দশার কারণে প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন চার্জার লাইট, হারিকেন আর মোমবাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিকল্প আলোর সরঞ্জাম কিনে দিন পার করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
রংপুর শহরের রিকশাচালক রহিম মিয়া (৪৫) দি ইনসাইটাকে বলেন,”সারাদিন প্যাডেল ঘুরায়ে শরীর ব্যথায় ভাইঙ্গা পড়ে। রাইতে বাসায় আইসা যে একটু শান্তিতে ঘুমামু, তার উপায় নাই। গ্রামে সকালেও বিদ্যুৎ থাকে না, রাতেও থাকে না। একটা চার্জার ফ্যান কিনছিলাম, কিন্তু চার্জ দিমু কোন সময়? কারেন্টই তো থাকে না। গরমে বাচ্চাটা রাতভর হাঁসফাঁস করে কান্দে, আর আমরা মোমবাতি জ্বালায়ে বাতাস করি।”
নেত্রকোনার দিনমজুর সাইফুল ইসলাম (৩৮) বলেন, “কাজের সন্ধানে রোদে পুড়ি, আর রাইতে আইসা দেখি কুচকুচে অন্ধকার। ১৭ ঘণ্টার বেশি কারেন্ট থাকে না আমাদের এলাকায়। হারিকেনের কেরোসিনের লিটারের দামও বাড়তি। মোমবাতি আর কয়েল জ্বালায়ে রাইত পার করতে হয়। আলো না থাকায় ছাওয়াল-মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার জোগাড়।”
একই জেলার হাইস্কুলের শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম (৪২) দি ইনসাইটাকে বলেন, “স্কুলের শ্রেণীকক্ষে গরমে ছোট ছোট ছাত্র-ছাত্রীরা বেহুশ হয়ে পড়ার মতো অবস্থা হয়। হাতপাখা নিয়ে ক্লাস নিতে হয়, তবুও পড়াশোনায় মন থাকে না। আর বাড়িতে রাতে আলো না থাকায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছে না। আমরা যেন এক মধ্যযুগীয় আঁধারে ফিরে গেছি।”
পাবনা জেলার দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ (১৭) বলেন,”সামনে পরীক্ষা, কিন্তু রাতে পড়ার টেবিলে বসার উপায় নেই। টেবিল ল্যাম্পের চার্জ ১ ঘণ্টাতেই শেষ হয়ে যায়। কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে পড়তে গিয়ে চোখ জ্বালা করে, মাথা ঘোরে। রাতে ঘুমের অভাবে দিনে ক্লাসে মন বসে না। সরকারের কাছে একটাই দাবি, আমাদের পড়ার সময়টুকু অন্তত আলো দিন।”
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদন মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। যশোরের অভয়নগরে ৮ আগস্ট রাতে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের ৪ শতাধিক মুরগি মারা গেছে, যার ফলে দুই তরুণ উদ্যোক্তার ক্ষতি হয়েছে তিন লাখ টাকার বেশি। কক্সবাজার, চাঁদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালীর মহিপুর-আলীপুরে ইলিশ মৌসুমে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। বরফ তৈরিতে ১২-১৫ ঘণ্টার জায়গায় সময় লাগছে দ্বিগুণ। ১৫০ টাকার বরফের ক্যান বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। খুলনার ১০৫টি হিমায়িত খাদ্য কারখানার প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যাহত হচ্ছে এবং ঘেরের এয়ারেটর চালাতে না পেরে চিংড়ি চাষিরা চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন।
রাজশাহীর বাঘার চকরাজাপুরে সেচ পাম্প চালাতে কৃষকদের ঘণ্টায় পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কুমিল্লা ও জয়পুরহাটের আলু ও বীজ হিমাগারে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অতিরিক্ত জেনারেটর খরচে জয়পুরহাটের এক হিমাগারেই মাসে বাড়তি ১৫ লাখ টাকা গুণতে হচ্ছে। পাবনায় সংরক্ষিত দেশি ও হাইব্রিড পেঁয়াজের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পচন ধরেছে।
দীর্ঘ বিদ্যুৎহীনতায় অতিষ্ঠ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জের জাউয়া বাজারে ব্যবসায়ীরা মশাল মিছিল নিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন। পাবনার ঈশ্বরদীতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিদ্যুৎকর্মীকে আটকে রাখেন। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় ১১ ও ১২ আগস্ট নেত্রকোনা ও রাজশাহী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জেলা প্রশাসনের কাছে উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেয় এবং আইজিপির কাছে সারাদেশে ৮০টি সমিতির নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়।
গ্রামাঞ্চলে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ (টুকু) দি ইনসাইট-কে বলেন, “গ্রামে যখন লোডশেডিং হয়, তখন দেখা যায় গ্রামে লোডের পরিমাণ কমে গেছে। লোড কমে যাওয়ার কারণে যেমন লোডশেডিং হয়, তেমনি শতভাগ বিদ্যুতায়ন করতে গিয়ে তারা গ্রামের বিদ্যুৎ লাইনগুলো অনেক বেশি লম্বা করে ফেলেছে। পর্যাপ্ত ট্রান্সফরমার না দেখিয়েই কিছু লাইন দেয়া হয়েছে। এগুলো আমরা এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যেখানে যা ব্যবস্থা বা উন্নয়ন করা প্রয়োজন, তা করা হবে।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেবল একটি নাগরিক সুবিধা নয়, এটি বর্তমান যুগের উৎপাদন ও জীবিকার মূল চালিকাশক্তি। এলএনজি টার্মিনাল সংস্কার বা নতুন জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়ার মাঝে শহর ও গ্রামের মধ্যকার বিদ্যুৎ বণ্টনের এই অন্যায্য বৈষম্য দ্রুত দূর করা জরুরি। ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে দেশের কৃষি, পোলট্রি ও শিল্প খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
বৈষম্যমূলক বণ্টনব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন “বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। শহরে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও গ্রামের মানুষ দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে। আর্থিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য নিয়মতান্ত্রিক লোডশেডিং করা গেলেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে এ ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাশ্রয়ের নীতি বাস্তবায়নে শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই সমতার ভিত্তিতে ও ন্যায়সঙ্গতভাবে বিদ্যুৎ বণ্টন করা উচিত।”



