ভয়াবহ তারল্য সংকটের দিকে ইসলামী ব্যাংক, একদিনেই পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিলেন গ্রাহকরা
বিতর্কিত চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে গ্রাহক অনাস্থা, একদিনেই প্রায় পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন ও ১১ হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধ—ব্যাংক খাতের জন্য কি সতর্ক সংকেত?
The Islami Bank crisis has deepened after a controversial chairman appointment triggered depositor distrust, large withdrawals and account closures. Beyond one bank’s liquidity pressure, the crisis now tests whether the Bangladesh government can deliver on its promise of banking reform and accountability.
দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক আবারও তীব্র আস্থাসংকটের মুখে পড়েছে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে পুরোনো শঙ্কা নতুন করে জেগে উঠেছে। এর জেরে সারাদেশে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় আমানত উত্তোলনের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের ৬৫০টি শাখা থেকে গ্রাহকরা প্রায় পৌনে ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। একই দিনে বন্ধ হয়েছে প্রায় ১১ হাজার অ্যাকাউন্ট। তবে ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার দি ইনসাইটাকে জানিয়েছেন, একদিনে উত্তোলনের পরিমাণ পৌনে ২ হাজার কোটি নয়, বরং প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ১১ হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধের তথ্য নিয়েও তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অ্যাকাউন্ট বন্ধ ও বেপরোয়া অর্থ উত্তোলন চলতে থাকলে আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই ব্যাংকের তারল্য শূন্যের কোটায় নামবে বলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই গ্রাহকরা তাদের আমানত তুলে নেয়ার এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেউ ভেঙে ফেলছেন দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্প, কেউ আবার তুলে নিচ্ছেন স্থায়ী আমানত (এফডিআর)।
এমনই একজন গ্রাহক মোহাম্মদ রফিক। প্রায় ১৩ মাস আগে তিনি ইসলামী ব্যাংকে মাসিক ১০ হাজার টাকা কিস্তিতে একটি ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) চালু করেছিলেন। পাঁচ বছর মেয়াদি এই সঞ্চয় প্রকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় অঙ্কের তহবিল গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাকে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে।
তিনি বলেন, “মেয়াদ পূর্ণ হলে যে মুনাফা পাওয়ার কথা ছিল, সেটি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। তবুও টাকা নিরাপদে হাতে রাখাটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।” রফিকের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ। তিনি বলেন, “আমার উদ্বেগের মূল কারণ হলো নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নাম আসা। অতীতে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো মানুষের মনে আছে।”
একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরেক গ্রাহক আব্দুর রশিদ। তিনি ইসলামী ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকার একটি স্থায়ী আমানত করেছিলেন। ওই আমানত থেকে প্রতি মাসে তিনি নির্দিষ্ট হারে মুনাফা পেতেন, যা তার পারিবারিক খরচের একটি সহায়ক উৎস ছিল। কিন্তু ব্যাংক ঘিরে সাম্প্রতিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তিনিও টাকা তুলে নিয়েছেন।
আবু্র রশিদ বলেন, “ব্যাংকটি একসময় দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এস আলমের ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে আসার পর নানা বিতর্ক হয়েছে। এখন খুরশিদ আলমকে চেয়ারম্যান করার ঘোষণার পর আবারও সেই পুরোনো প্রভাব ফিরে আসতে পারে। আমি ঝুঁকি নিতে চাইনি, তাই এফডিআর ভেঙে টাকা তুলে নিয়েছি।” তিনি বলেন, “প্রতি মাসে মুনাফা পেতাম। সেটি বন্ধ হয়ে গেলেও অন্তত মূলধন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না।”
ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের নগদ তারল্য ছিল প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২৫ মে ৩০০ কোটি টাকার মতো কমে তা দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪০০ কোটিতে। পরদিন আরও ১৫০ কোটি টাকা কমে তারল্য হয় ১১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ২৭ ও ২৮ মে ব্যাংকটির তারল্য ছিল প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ওই সময় কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে পশু কেনা, ঈদের বাজার ও অন্যান্য খরচের জন্য গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই টাকা উত্তোলন করেছিলেন। ঈদ শেষে পশু বিক্রির অর্থ, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং অন্যান্য আমানত ফেরত আসায় ১ জুন ২০২৬ তারিখে ব্যাংকটির তারল্য বেড়ে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।
তবে একই দিনে নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের বিক্ষোভের মধ্যেই আমানত তুলে নেয়ার প্রবণতা হঠাৎ বেড়ে যায়। ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২ জুন ২০২৬ তারিখে গ্রাহকরা সারাদেশে সবমিলিয়ে প্রায় পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেন। ফলে ৩ জুন ব্যাংকটির তারল্য নেমে আসে প্রায় ১০ হাজার ২৫০ কোটি টাকায়।
ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বড় ধরনের তারল্য চাপে পড়তে পারে ইসলামী ব্যাংক। তাদের আশঙ্কা, গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনাস্থা কাটানো না গেলে আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। এমনকি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শূন্যের কোটায় নেমে আসতে পারে ব্যাংকের তারল্য। এমনটা হলে সপ্তাহ দুই পর গ্রাহকরা কোনো শাখায় টাকা তুলতে গেলে ব্যাংক টাকা দিতে পারবে না।
তবে তারল্য সংকট মানেই কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়া নয়। একটি ব্যাংকের সম্পদ, ঋণ পোর্টফোলিও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা, বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সামর্থ্য এবং আমানতকারীদের আস্থা—সবকিছু মিলেই তার বাস্তব অবস্থান নির্ধারিত হয়। কিন্তু তারল্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সেটি দ্রুত আস্থাসংকটে রূপ নিতে পারে, আর আস্থাসংকট ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক সংকেত।
এই বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার দি ইনসাইটাকে বলেন, একদিকে এতোগুলো টাকা তুলে নেয়া একটা বড় ধাক্কা। আবার আরেকদিকে এটাকে স্বাভাবিকও বলা যায়। অতীতেও এভাবে মানুষ টাকা তুলে নিয়ে গেছে। আবার ফেরতও এসেছে। তবে এটা যদি গ্রাহকদের আন্দোলনকে ঘিরে হয় এবং এই টাকা উত্তোলণ কর্মসূচি চলতে- তাহলে অবশ্যই এটা ইসলামী ব্যাংকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি। যদিও আমরা আশা করি এই পরিস্থিতি থাকবে না।
কিভাবে এই সংকট উত্তরণ করবে ইসলামী ব্যাংক—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের ম্যানেজমেন্টের কিছু স্ট্রাটিজি আছে। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখো হয়েছি আমরা। কিন্তু সেটা কেটেও উঠেছি। আমরা অবশ্যই চাইবো- জনগণের যে পারসেপশনে, সেখানে যেনো আস্থাটা টিকে থাকে, সেই চেষ্টা করে যেতে।
দীর্ঘমেয়াদি আমানত হিসাব বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, “সেভিংস বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সেভাবে বন্ধ হচ্ছে না। মানুষ মূলত তার ডিপিএসগুলো তুলে নিচ্ছে। তবে মানুষের এই অভিমান বেশিদিন থাকবে না। কারণ, দিনশেষে মানুষ শরিয়াহভিত্তিক যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চায়, সেই আস্থার ঠিকানাই ইসলামী ব্যাংক। সুতরাং আমি মনে করি মানুষ ফেরত আসবেই।”
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আমানত হিসাব একটি ব্যাংকের স্থিতিশীল তহবিলের অন্যতম প্রধান উৎস। সাধারণ সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাবের তুলনায় এসব আমানত দীর্ঘ সময় ব্যাংকে থাকে এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বিপুল সংখ্যক ডিপিএস ও মেয়াদি আমানত হিসাব বন্ধ হওয়া ব্যাংকটির জন্য উদ্বেগের বিষয়।
এই কারণেই ডিপিএস ও এফডিআর ভাঙার প্রবণতা সাধারণ উত্তোলনের চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। কারণ এটি শুধু তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের চাপ তৈরি করে না, বরং গ্রাহকের ভবিষ্যৎ আস্থার সংকেতও দেয়। একজন গ্রাহক দৈনন্দিন খরচের জন্য টাকা তুললে সেটি স্বাভাবিক ব্যাংকিং আচরণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্প ভেঙে ফেললে সেটি সাধারণত নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা অথবা আস্থাহীনতার প্রকাশ।
তারল্য সংকট আসলে কি?
তারল্য সংকট মানেই কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়া নয়। সহজভাবে বললে, এটি এমন এক পরিস্থিতি, যখন একটি ব্যাংকের হাতে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত নগদ অর্থ থাকে না। একটি ব্যাংক মূলত গ্রাহকদের জমা রাখা আমানতের একটি বড় অংশ অন্য গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ হিসেবে দেয়। তবে সব টাকা ঋণ দেওয়া হয় না। নির্দিষ্ট একটি অংশ নগদ হিসেবে ব্যাংকের ভল্টে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়, যাতে গ্রাহকরা প্রয়োজন হলে টাকা তুলতে পারেন।
কিন্তু কোনো কারণে যদি গ্রাহকদের মনে ভয় তৈরি হয় যে “ব্যাংক ডুবে যাচ্ছে” বা “আমার টাকা আর পাব না”, তখন একসঙ্গে অনেক গ্রাহক টাকা তুলতে শুরু করেন। কোনো ব্যাংকের পক্ষেই একসঙ্গে সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ আমানতের বড় অংশই ঋণ ও বিনিয়োগে খাটানো থাকে।
এর সঙ্গে যদি ঋণগ্রহীতারা সময়মতো টাকা ফেরত না দেন, অথবা নিয়মবহির্ভূতভাবে বড় অঙ্কের টাকা বেনামি ঋণ, সন্দেহজনক ঋণ বা পাচারের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়, তাহলে ব্যাংকের নগদ প্রবাহ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন তারল্য সংকট শুধু সাময়িক নগদ ঘাটতি থাকে না; এটি ধীরে ধীরে আস্থার সংকটে রূপ নিতে পারে।
এ ধরনের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকগুলো সাধারণত কয়েকটি পথ নেয়। তারা কল মানি মার্কেট থেকে স্বল্পমেয়াদে অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার করতে পারে; বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে রেপো বা বিশেষ সহায়তার আওতায় অর্থ চাইতে পারে; অথবা নিজেদের হাতে থাকা বন্ড ও সরকারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে দ্রুত নগদ অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করতে পারে।
চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে আন্দোলন ও হামলার ঘটনা
২৪ মে ঈদুল আজহার ছুটির আগের শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জোবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওই রাতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ঈদের ছুটির মধ্যেই বিভিন্ন জেলায় ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন শুরু হয়।
ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শত শত গ্রাহক দিনব্যাপী বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনকারীরা খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল, এস আলম গ্রুপের পাচার করা অর্থ ফেরত আনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগের দাবি জানান। একই সময়ে ঢাকা ছাড়াও সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাহকদের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
১ জুন ঢাকায় আন্দোলনরত গ্রাহকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। জলকামান এবং টিয়ারগ্যাসও নিক্ষেপ করা হয়। এতে কয়েকজন গ্রাহক আহত হন।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। আন্দোলনের মুখে নতুন চেয়ারম্যান সশরীরে ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে বোর্ডরুমে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পরিচালনা পর্ষদের সভা অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান চেয়ারম্যান খুরশিদ আলমের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, এটা সরকারের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিষয়। আশা করি, ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতি হয়- এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না সরকার।
খুরশীদ আলমের প্রতি অনাস্থার কারণ কী?
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ পুনর্বিবেচনা বা বাতিলের দাবিতে গ্রাহকদের এই অনড় অবস্থানের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও কারণ রয়েছে। আন্দোলনকারী গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, খুরশীদ আলমের নিয়োগ ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, অতীতে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে যে বিতর্ক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
গ্রাহকদের একটি অংশ মনে করছেন, তাদের আমানতের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অনেকে ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি আমানত ভেঙে টাকা তুলে নিচ্ছেন।
আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগ হলো, মো. খুরশীদ আলম বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর ঘনিষ্ঠ বা তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ব্যক্তি। গ্রাহকদের আশঙ্কা, দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটি যখন বিগত বছরগুলোর আর্থিক অনিয়ম কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন তার মতো কারো নেতৃত্ব ব্যাংকটিকে আবারও নতুন করে আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
খুরশীদ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে কর্মকর্তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে যে কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, খুরশীদ আলম ছিলেন তাদের অন্যতম। গ্রাহকদের দাবি, যাকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, তাকেই আবার ইসলামী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২৪ মে খুরশীদ আলমের নিয়োগের দিনই ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পরিচালনা পর্ষদ ‘বাধ্যতামূলক ছুটিতে’ পাঠায়। গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, ব্যাংকটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতেই বর্তমান পর্ষদ ও নতুন চেয়ারম্যান মিলে এই জোরপূর্বক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই গ্রাহকদের অন্যতম দাবি, ওমর ফারুক খানকে তার পদে পুনর্বহাল করা এবং খুরশিদ আলমের অপসারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা ও নৈতিক প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে খুরশীদ আলমকে ‘ঋণখেলাপি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিতর্ক ওঠার পর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্পষ্টীকরণ বিজ্ঞপ্তি দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন। তবে তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) টাকা ঋণ নিয়ে পরবর্তীতে খেলাপি হয়েছে। আন্দোলনকারীরা এই নৈতিক স্থলনকেও তার চেয়ারম্যান পদের অযোগ্যতা হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ব্যাখ্যা আইনি প্রশ্নের একটি অংশের জবাব দিলেও নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার প্রশ্ন দূর করতে পারেনি। কারণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ শুধু আইনি যোগ্যতার বিষয় নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে যে ব্যাংক অতীতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত মালিকানা, অনিয়মিত ঋণ এবং তারল্যচাপের অভিযোগে আলোচনায় ছিল, সেখানে চেয়ারম্যান নিয়োগে ন্যূনতম বিতর্কও বড় আস্থাসংকটে রূপ নিতে পারে।
এস আলম-পরবর্তী প্রশ্ন এখনো শেষ হয়নি
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট বুঝতে হলে এর আগের প্রেক্ষাপট ভুলে গেলে চলবে না। ২০১৭ সালের পর থেকে ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। পরবর্তী বছরগুলোতে এস আলম গ্রুপের প্রভাব, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের ঋণ, সন্দেহজনক ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের আস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে।
রয়টার্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি বড় আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান—EY, Deloitte এবং KPMG—নিয়োগ করেছে এমন কিছু ব্যাংকের সম্পদমান পর্যালোচনার জন্য, যেগুলো থেকে সাবেক শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করেছে পাচার হওয়া সম্পদ চিহ্নিত ও পুনরুদ্ধারের জন্য।
এই প্রেক্ষাপট ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকটকে আরও গুরুতর করে তোলে। কারণ গ্রাহকদের চোখে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং তারা এটিকে অতীতের ব্যাংক দখল, ঋণ লুট এবং নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার ধারাবাহিকতার ভেতরেই দেখছেন।
ব্যাংক খাতের সংকট এখন জাতীয় অর্থনীতির ঝুঁকি
ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি আমানতকারীর আচরণ, অন্য ব্যাংকের ওপর চাপ, ব্যবসায়িক লেনদেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এমন সময় এই সংকট তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি নিজেই চাপের মধ্যে রয়েছে। রয়টার্সের ২৩ মে ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০০ বিলিয়ন টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উচ্চ ঋণব্যয়, স্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং কঠিন অর্থায়ন পরিস্থিতি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে চাপে ফেলছে।
এই বাস্তবতায় ব্যাংক খাতে নতুন আস্থাহীনতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। একটি বড় ব্যাংকের তারল্যচাপ যদি দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে তা আমানতকারীদের আচরণে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। আবার অতিরিক্ত গোপনীয়তা, অস্পষ্ট নিয়োগ, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিদ্ধান্ত সেই অনিশ্চয়তাকে আরও গভীর করতে পারে।





