পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় কোন পথে বাংলাদেশ- পূর্বে না পশ্চিমে?
বাংলাদেশের “আসল বন্ধু” বক্তৃতায় নয়; নির্ধারিত হয় বাণিজ্য, সরবরাহ শৃঙ্খল, জ্বালানি ও ইন্দো-প্যাসিফিক ভারসাম্যে। চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র টানাপড়েনে একমুখীতা নয়, ভারসাম্য নীতিই জাতীয় স্বার্থের চাবিকাঠি।
A “real friend” of Bangladesh is defined not by rhetoric but by trade flows, supply chains, energy security, and Indo-Pacific geopolitics. As the US, China, and India vie for influence in the Bay of Bengal, Dhaka must resist one-sided dependence and pursue a calibrated strategy to safeguard its national interests, export markets, and security priorities.
Keywords: Bangladesh, Indo-Pacific, Bay of Bengal, trade dependence, supply chain, geopolitical influence
বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতিতে কোন পক্ষ “আসল বন্ধু”—এই প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; বরং এটি ট্রেড কাঠামো, ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের উপর নির্মিত একটি জটিল সমীকরণ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নটি আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলটি হয়ে উঠেছে প্রভাববলয়ের এক ভয়ংকর খেলার মাঠ—যার রেফারি স্বয়ং “ডিপ স্টেট”-এর শক্তিশালী স্টেকহোল্ডাররা।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি নতুন সরকার গঠনের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি Donald J. Trump বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠান। এর আগে Narendra Modi-ও ঢাকাকে শুভেচ্ছা জানান। এই দুটি বার্তা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবর্তিত শক্তির সমীকরণের একটি ইঙ্গিতও বহন করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিঠিতে বাংলাদেশকে তিনটি কৌশলগত বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়, যেমন—
Free and Open Indo-Pacific ধারণার অধীনে উন্মুক্ত ও নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত করা,
Routine Defense Engagements-এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা, এবং
Reciprocal Trade and Supply Chain Security-এর ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই বার্তাগুলো ইঙ্গিত করে যে “আমেরিকা” দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির নতুন ভারসাম্য নির্মাণে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে Bay of Bengal-কেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থাপত্যে বাংলাদেশের ভূমিকাকে তারা কৌশলগত দৃষ্টিতে দেখছে।
বঙ্গোপসাগর এখন শুধু একটি সামুদ্রিক অঞ্চল নয়। এটি সমুদ্রপথ, জ্বালানি পরিবহন, সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং প্রতিরক্ষা কৌশলের বহুমুখী কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চিমা জোট যেমন এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী, তেমনি চীন-ভারতও নিজেদের নিরাপত্তা বলয় সুসংহত করতে মরিয়া। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে এই শক্তিগুলোর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে সমান্তরাল হলেও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তীব্র।
এছাড়াও, ইন্দো-প্যাসিফিক এখন আর কেবল নীতিগত “ধারণা” নয়। এটি বাস্তব নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থাপত্য ও ভূ-রাজনীতির অন্যতম সমীকরণ হিসেবে এক কৌশলী রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল, ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ নীতি এবং চীনের অবকাঠামো ও সামুদ্রিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ক্ষমতার বিন্যাস আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও জটিল হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন সরাসরি বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত। এই পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকেই “নতুন ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র” বলা হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র তার Indo-Pacific Strategy-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা বলয় জোরদার করছে। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, জোটভিত্তিক সহযোগিতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলকে তার বৈশ্বিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, চীন অনেক আগেই তার Belt and Road Initiative (BRI) প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় গভীর প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। Gwadar Port, Hambantota Portসহ বিভিন্ন বন্দর ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ, সড়ক-রেল যোগাযোগ উন্নয়ন এবং Indian Ocean-এ নৌ-উপস্থিতি বৃদ্ধির মাধ্যমে বেইজিং তার অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব দ্রুত সম্প্রসারিত করছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়া এখন শুধু আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা একদিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে শক্তির ভারসাম্য ও নিরাপত্তা রাজনীতিকে আরও সংবেদনশীল ও জটিল করে তুলছে।
এদিকে, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। ভৌগোলিক সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তবে ইতিহাসের কিছু অভিজ্ঞতা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে, যা কৌশলগত বাস্তবতার আলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তাও দেখায়।
অন্যদিকে, চীনও এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অবকাঠামো বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সামুদ্রিক সংযোগের মাধ্যমে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে? ট্রাম্পের চিঠি কেবল অভিনন্দন বার্তা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত। বাংলাদেশ কি ইন্দো-প্যাসিফিক স্থাপত্যে একটি সক্রিয় কৌশলগত খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, নাকি কেবল ভৌগোলিক গুরুত্বের কারণে প্রাসঙ্গিকই থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের উপর—যেখানে রপ্তানি-আমদানি নির্ভরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য একটি অভিন্ন কাঠামোতে বিবেচিত হবে।
আমরা জানি, ডিপ স্টেট বলতে এমন এক স্থায়ী প্রশাসনিক-নিরাপত্তা নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়—যারা সরকার বদলালেও প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে যায় এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। আবার “রাষ্ট্রের গভীর কৌশলগত কাঠামো” (deep state বা কৌশলগত রাষ্ট্রযন্ত্র) বলতে বোঝায়—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সামুদ্রিক কৌশল নির্ধারণকারী সেই অভ্যন্তরীণ কাঠামো, যা দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রের স্থায়ী বন্ধু নেই—স্থায়ী স্বার্থই মূল বিবেচ্য। এই বাস্তবতা সামনে রেখে বাংলাদেশকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা তাকে প্রতিযোগিতামূলক শক্তির সংঘাতে জড়িয়ে না ফেলে এবং কৌশলগত ভারসাম্যের মাধ্যমে নিজস্ব স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে সুরক্ষিত করতে সক্ষম করে।
বাংলাদেশের পূর্ব ও পশ্চিমমুখী বাজার ও নির্ভরতার ধরন বুঝতে কিছু মৌলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান জানা জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানি, আমদানি, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও ঋণনির্ভরতার দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি স্পষ্ট হয়।
১) বাণিজ্য ও বাজার
বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চীন বর্তমানে দেশের প্রধান সরবরাহকারী এবং বৃহত্তম আমদানি উৎস। মোট আমদানির প্রায় ২৫–২৭ শতাংশ চীন থেকে আসে। বছরে প্রায় ২৩–২৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হয়; বিপরীতে রপ্তানি মাত্র ১–২ বিলিয়ন ডলার। শিল্প কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স এবং বিভিন্ন উৎপাদন উপকরণের ক্ষেত্রে চীনের উপর বাংলাদেশের নির্ভরতা অনেকাংশেই বেশি। ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে হঠাৎ কোনো বিঘ্ন ঘটলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা উৎপাদন সংকট দেখা দিতে পারে। দ্রুত বিকল্প উৎসে সরে যাওয়াও কঠিন হয়ে উঠবে। ভূ-অর্থনীতির ভাষায় এটি “একদিক নির্ভরতা”, যা অর্থনৈতিক ঝুঁকির পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপের সম্ভাবনাও তৈরি করে।
অন্যদিকে, ভারত বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১২–১৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি করে এবং রপ্তানি করে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। আমদানির ক্ষেত্রে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলেও নির্ভরতার মাত্রা চীনের তুলনায় কম। তবে সীমান্ত নীতি, কাস্টমস জটিলতা বা রাজনৈতিক টানাপড়েন বাণিজ্য প্রবাহে প্রভাব ফেলে থাকে। তবুও ভৌগোলিক নৈকট্য, আঞ্চলিক সংযোগ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক লেনদেন দুই দেশের মধ্যে একটি কার্যকর নির্ভরতার ভারসাম্য তৈরি করেছে।
বিপরীত চিত্র দেখা যায় আমেরিকার ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। বছরে প্রায় ৮–১০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য সেখানে রপ্তানি করা হয়; বিপরীতে আমদানি মাত্র ২–৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এখানে বাণিজ্য ভারসাম্য বাংলাদেশের পক্ষে এবং এটি রপ্তানি-নির্ভর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি শক্তিশালী উৎস।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে মার্কিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বেজলাইন ট্যারিফ কাঠামোর উপর আরও ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলেও তা অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে সহনীয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাংলাদেশের জন্য “ঘরে বৈদেশিক মুদ্রা আনা”—কেন্দ্রিক একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
২) কোনটি জাতীয় স্বার্থের কাছে বেশি উপযোগী?
চীন-রাশিয়া-ভারত ব্লক: এই বলয় বাংলাদেশের জন্য আমদানি সহজ করে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে এই দেশগুলো থেকে সহায়তা ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এসেছে, যা শিল্পায়ন ও জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই বলয়ের ক্ষেত্রে একমুখী নির্ভরতার ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষত চীন কেবল বাজার নয়, রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তারেও আগ্রহী—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে। ভারতও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে নিজের প্রভাব বলয়ে রাখতে মরিয়া। ফলে এখানে সুযোগ ও ঝুঁকি—উভয়ই উপস্থিত। সামগ্রিকভাবে এটি বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ একটি পথ। অনেকেই এই ব্লককে “ডিপ স্টেট”-এর অন্যতম অংশীজনও বলে থাকেন—যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে থাকেন।
পশ্চিমা অগ্রাধিকার / যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার: এই ব্লকটি বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজার। এখানে সহজে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি করা যায়। তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। সামাজিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চললে দীর্ঘমেয়াদি বাজার সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক চাপ কম থাকলেও ঋণ ও মূলধনী সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুবিধা কম রয়েছে—ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, বিশেষ করে বিকল্প উৎস সীমিত হলে। তবুও রপ্তানি-আমদানি নির্ভরতা এবং ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের বিচারে এই বাজারগুলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণে এই ব্লকটিও বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন “ডিপ স্টেট”-এর স্টেকহোল্ডার বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
৩) কৌশলগত অবস্থান হতে পারে ভারসাম্য নীতি
বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একপাক্ষিকভাবে কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া কৌশলগতভাবে সমীচীন নয়। বরং প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক। যেখানে থাকবে—পশ্চিমা বাজারে রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলা ধরে রাখার অভিন্ন কৌশল, প্রতিবেশী ভারতকে সমবায় ও টেকসই অংশীদার হিসেবে উন্নত করা, এবং রেমিট্যান্স-ভিত্তিক সম্পর্ক (যেমন সৌদি আরব ও আরব আমিরাত) বজায় রাখা। ভারসাম্য রক্ষাই এখানে মূল শক্তি।
৪) “কেউ বন্ধু নয়—স্বার্থই বন্ধু”
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দেশই সম্পূর্ণ বা চিরস্থায়ী বন্ধু নয়। বন্ধুত্ব অনেক সময় শর্তসাপেক্ষ এবং স্বার্থনির্ভর। যদি জাতীয় নীতি আবেগভিত্তিক হয়ে পড়ে এবং কোনো বড় বাজার বা শক্তিধর দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়, তবে তা ভবিষ্যতে সংকট ডেকে আনতে পারে। জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারসাম্যই সবচেয়ে শক্তিশালী অবলম্বন। এতে বাণিজ্য টেকসই হয়, নিরাপত্তা স্থিতিশীল থাকে এবং উদ্ভূত সুযোগগুলো কৌশলগতভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়। এতে “ডিপ স্টেট”-এর স্টেকহোল্ডাররা শক্তিশালী হলেও অভ্যন্তরীণ ঐক্যই সামনে এগিয়ে চলার সমাধান এনে দেয়।
সমুদ্র, সরবরাহ শৃঙ্খলা, প্রতিরক্ষা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। আর ঢাকার সিদ্ধান্তই ঠিক করবে—এই খেলায় সে পর্যবেক্ষক, নাকি নীতিনির্ধারক। বাংলাদেশের আছে কি সেই সাহস? কিংবা নীতি নির্ধারণী কৌশল?
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সমুদ্রপথ, সরবরাহ শৃঙ্খলা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর-সংলগ্ন অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্য রুটের সংযোগ এবং ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো উন্নয়ন বাংলাদেশকে বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত সমীকরণে এনে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের কৌশলগত অভ্যন্তরীণ কাঠামোর সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি কেবল বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় একজন পর্যবেক্ষক হয়ে থাকবে, নাকি নিজস্ব স্বার্থ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে সক্রিয় নীতিনির্ধারক হিসেবে ভূমিকা নেবে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—রাষ্ট্র কতটা সুসংগঠিত কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে পারে তার ওপর।





