সংসদের বিধি লঙ্ঘন করেও প্রশংসা কুড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
সংসদে পত্রিকা পড়া বিধিবহির্ভূত হলেও প্রধানমন্ত্রীর এ আচরণকে ঘিরে গণমাধ্যমে প্রশংসার জোয়ার। আইন লঙ্ঘন কেন প্রশ্নহীন রইল, আর গণমাধ্যমের ভূমিকা কতটা নিরপেক্ষ- এই বিতর্কেই কেন্দ্রীভূত এই প্রতিবেদন।
Despite clear parliamentary rules prohibiting it, the prime minister’s act of reading newspapers during sessions has drawn media praise. This piece questions why a violation escapes scrutiny and examines what such coverage reveals about media independence, accountability, and democratic norms.
“প্রধানমন্ত্রী সংসদে একমনে পত্রিকা পড়ছেন। দেশের কোথায় কী ঘটছে, সব সংবাদে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন। অধিবেশন চলাকালেও তিনি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে খুবই সচেতন, খুবই মনোযোগী।” সংসদে বসে পত্রিকা পড়ার কারণে ঠিক এভাবেই প্রশংসা কুড়াচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।
যদিও এই কাজ স্পষ্টই সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির লঙ্ঘন। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, অধিবেশন বা সংসদের বৈঠক চলাকালে কোনো সদস্য পত্রিকা পড়তে পারবেন না।
যেখানে অন্য কোনো সদস্য বিধি ভাঙলেই প্রশ্নের মুখোমুখি হন, স্পিকার স্পষ্টভাবে বিধি লঙ্ঘনের জন্য তাদের সরাসরি ধরিয়ে দেন—সেখানে প্রধানমন্ত্রী বিধি ভেঙে কেন প্রশংসা পাচ্ছেন? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। এমনকি গণমাধ্যমগুলো বিধি পর্যালোচনা না করে বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৩১ মার্চ ফেসবুকে একটি ছবি শেয়ার করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। ছবিতে দেখা যায়, সংসদের কার্যক্রম চলমান থাকলেও প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন, গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ছেন। অতিরিক্ত প্রেস সচিবের এই পোস্টের সূত্র ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দৈনিক সমকাল, বাংলাভিশন, জাগোনিউজসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে উল্টো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করা হয়েছে প্রতিবেদনগুলোতে।
গত ১ এপ্রিল দৈনিক সমকালের অনলাইনে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, “সংসদের কার্যক্রম চলমান থাকলেও প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো পর্যালোচনা করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর সম্পর্কে অবগত থাকার অংশ হিসেবেই তিনি পত্রিকা দেখছিলেন।”
একইদিনে নাগরিক প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলাকালেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের প্রতি নিজের সচেতনতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।” এতে আরো বলা হয়, “রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও মনে করছেন, সংসদ অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও পত্রিকার ওপর নজর রাখা সরকারের নীতি নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে।”
যদিও এসব প্রতিবেদনে “সংশ্লিষ্ট” কিংবা “রাজনৈতিক বিশ্লেষক” হিসেবে কাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সাবেক প্রধান বার্তা সম্পাদক সাজিদ হক বলেন, “সংশ্লিষ্ট” কিংবা “রাজনৈতিক বিশ্লেষক”—এগুলো এক ধরনের গায়েবি শব্দ। এসব শব্দ দিয়ে মিডিয়া মূলত নিজের ন্যারেটিভ প্রচার করে। এখানে “সংশ্লিষ্ট” কে? “রাজনৈতিক বিশ্লেষক” কে? এটা পরিষ্কার করা উচিত ছিল।
জাগো নিউজের খবরে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পত্রিকা পড়ার ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে গণমাধ্যমগুলোর এই প্রতিবেদন কতটা আইন-বিধি পর্যালোচনা করে লেখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ, সংসদ অধিবেশনে পত্রিকা পড়া মোটেও বিধিসম্মত নয়।
গণমাধ্যম যেখানে গঠনমূলক সমালোচনা করবে কিংবা ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে রাখবে, সেখানে গণমাধ্যমের এই আজ্ঞাবহ ভূমিকা কতটা গ্রহণযোগ্য? সাজেদুল হক বলেন, বাংলাদেশে বিগত শেখ হাসিনার শাসনামলে আমরা দেখেছি, মিডিয়া মোটাদাগে সরকারের প্রশংসায় মুখর ছিল। এখনও সে প্রবণতার শুরুর একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যেমন ধরুন—মিডিয়ায় বহুল আকাঙ্খিত সংস্কার ইস্যু সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না; অথচ প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসামূলক নানা খবর প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। মিডিয়া তার যথাযথ ভূমিকা রাখবে—এমন আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশসহ অনুরূপ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদীয় বিধিতে অধিবেশন চলাকালে অপ্রাসঙ্গিক সংবাদপত্র পড়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। এটি কেবল বিধি লঙ্ঘনই নয়, বরং এমন আচরণকে সাধারণভাবে অপেশাদার ও অসম্মানজনক হিসেবে দেখা হয়, কারণ এটি মনোযোগ নষ্ট করে, আলোচনার গুণগত মান ক্ষুণ্ন করে এবং সংসদের মর্যাদাকে হ্রাস করে।
জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৮তম অধ্যায়ে সংসদ সদস্য কর্তৃক পালনীয় বিধানগুলো উল্লেখ করা আছে। বিধির ২৬৭ ধারার (৩) উপধারায় বলা হয়েছে, সংসদের বৈঠক চলাকালে সংসদের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন কোনো বই, সংবাদপত্র বা চিঠিপত্র পাঠ করা যাবে না। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আল মামুন রাসেল দ্য ইনসাইটাকে বলেন, সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে—সংসদের বৈঠক চলাকালে কোনো সদস্য সংবাদপত্র পাঠ করতে পারবেন না। এই বিধি অনুযায়ী- কেউ সংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া যদি পত্রিকা পড়তে থাকেন, তাহলে তিনি বিধি লঙ্ঘন করেছেন। প্রসঙ্গত, একই অধ্যায়ের একই ধারার ১১ উপধারায় বলা আছে—সংসদের দর্শক গ্যালারিতে থাকা কাউকে উদ্দেশ্য করে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না। সেই ধারাবলে, গত ৩১ মার্চ নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদকে সতর্ক করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। হান্নান মাসুদ গ্যালারিতে থাকা তার বাবার কথা উল্লেখ করেছেন বক্তব্যে।
অধিকাংশ দেশেই সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধিতে “অপ্রাসঙ্গিক সংবাদপত্র পাঠ” নিষিদ্ধ, তবে “সংশ্লিষ্ট বিষয়ের রেফারেন্স হিসেবে” তা ব্যবহারের সুযোগ থাকে। বাংলাদেশেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের রেফারেন্স হিসেবে পত্রিকা পড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কদিন পত্রিকা পড়েছেন, সেখানে তিনি দেশের খোঁজখবরের জন্যই পড়ছেন—এমনটাই গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি সংসদে যে বিল উত্থাপিত হয়েছে কিংবা যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—সেসব বিষয়ে কোনো সংবাদ পড়েছেন বলে সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সংসদ টিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী যে কদিন পত্রিকা পড়েছেন, সেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পত্রিকা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জবাব দিয়েছেন—এমন কোনো উদাহরণও নেই।
সম্প্রতি জামায়াতের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ সংসদে সিটি করপোরেশনগুলোতে অনির্বাচিত প্রশাসক বসানো নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সেখানে দেখা যায়, হেডফোন খুলে প্রধানমন্ত্রী পত্রিকা পড়ছেন। এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম মাসুদ দি ইনসাইটাকে বলেন, সংসদের প্রতিটি মিনিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে জনগণের টাকায় সংসদ পরিচালিত হয়, এবং তা খুব ব্যয়বহুল। তাই সংসদে প্রত্যেক সদস্যেরই মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা উচিত, নোট করা উচিত। তা না করে কেউ যদি পত্রিকা পড়েন, তাহলে আমরা কীভাবে বুঝব—তিনি আমার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন? বিশেষ করে সংসদ নেতার তো আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। অথচ আমি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী বসে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। তার মানে আমরা ধরেই নিতে পারি, আমাদের কথাগুলো বাস্তবায়নযোগ্য হলেও তা সঠিকভাবে শোনা হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংসদীয় রীতিনীতি বা কার্যপ্রণালী বিধিতে অধিবেশন চলাকালে সংসদ সদস্যদের পত্রিকা পড়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে।
ভারতের সংসদীয় বিধির ৩৪৯ নম্বর ধারা (Rule 349) অনুযায়ী, অধিবেশন চলাকালে কোনো সদস্য বই, সংবাদপত্র বা চিঠিপত্র পড়তে পারবেন না। তবে একটি শর্ত আছে—যদি সেই সংবাদপত্র বা বইয়ের তথ্য সরাসরি অধিবেশনের কোনো আলোচনার (Business of the House)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তা পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া কোনো তথ্য উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হয়।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও একই ধরনের রীতি প্রচলিত। সেখানে এমপিদের জন্য নিয়ম হলো, তারা চেম্বারে বসে সংবাদপত্র বা ম্যাগাজিন পড়তে পারবেন না। এমনকি বর্তমানে ডিজিটাল যুগের কারণে ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও তা কেবল সংসদীয় কাজের জন্য ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। যদি কোনো এমপিকে সংবাদপত্র পড়তে দেখা যায়, তবে স্পিকার তাকে সতর্ক করতে পারেন।
কানাডার হাউস অব কমন্সেও সাধারণ নিয়ম হলো—অধিবেশন চলাকালে সংবাদপত্র পড়া যাবে না। তবে যদি কোনো সদস্য তার বক্তব্যের সপক্ষে কোনো সংবাদপত্রের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতে চান, তবে তিনি তা করতে পারেন। কিন্তু কেবল সময় কাটানোর জন্য বা ব্যক্তিগত বিনোদনের জন্য পত্রিকা পড়া সেখানে অশোভন এবং নিয়মবহির্ভূত হিসেবে গণ্য হয়।
মূলত সংসদের মর্যাদা রক্ষা এবং অধিবেশনের কাজে একাগ্রতা বজায় রাখার জন্যই এই নিয়ম করা হয়েছে। সংসদ একটি পবিত্র স্থান, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত কাজে সংবাদপত্র পড়া সংসদের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক চলাকালে সদস্যরা যাতে অন্যমনস্ক না হন, তা নিশ্চিত করার জন্যই দেশে দেশে সংবাদপত্র পড়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।





