বিচারের অপেক্ষায় দেড় লক্ষাধিক ধর্ষণ মামলা, দেড়যুগে সর্বোচ্চ সাজা মাত্র ৫ জনের!
দেড় লক্ষাধিক ধর্ষণ মামলা ঝুলছে। রায় ও দণ্ড কার্যকরেও অগ্রগতি নেই। দুর্বল তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব, ফরেনসিক ঘাটতি ও আপিল-জট বিচারহীনতাকে আরও গভীর করছে প্রতিদিন। ফলে ভুক্তভোগীরা অপেক্ষায়।
More than 150,000 rape cases remain pending in Bangladesh, while only five death sentences have been carried out in 18 years. This special report examines how weak investigations, forensic delays, poor witness protection and appeal backlogs deepen a culture of impunity.
সোহাগী জাহান তনু। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী। ১৯ বছরের এক চঞ্চল হাসিখুশি তরুণী। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয় তার রক্তাক্ত মরদেহ। ডিএনএ পরীক্ষায় গণধর্ষণের প্রমাণ মিলে। কিন্তু শুরু থেকেই ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন ছাত্র ও গণআন্দোলন গড়ে উঠলেও থানা পুলিশ, ডিবি এবং সিআইডি বছরের পর বছর তদন্ত করে কোনো আসামি শনাক্ত করতে পারেনি। ২০২০ সালে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই এর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার দীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এই মামলার কোনো কুল কিনারা হয়নি। ২০২৬ সালে এসেও আদালতে কোনো চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চরম বিচারহীনতার প্রতীক হয়ে আছে তনু হত্যাকাণ্ড।
২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়। ৬ বছরেও বিচার শুরু হয়নি ওই ঘটনার। সহায় সম্বল সব বিক্রি করে মামলা চালাচ্ছেন ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বাবা। ২০২১ সালে মিঠাপুকুর উপজেলায় এক তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। সে বছর মামলা করেছিলেন ভুক্তভোগীর পরিবার। গত ৫ বছরেও বিচারকাজ শুরু হয়নি ওই মামলার। ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রমজান মাসে সাহরি খেতে ওঠার সময় কক্সবাজারের উখিয়ায় দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষে মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত কোনো রায় এখনো আসেনি।
২০২৪ সালের শেষের দিকে নরসিংদীতে এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। ভুক্তভোগীর পরিবার প্রথমে আইনি জটিলতা এড়াতে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীদের কাছে বিচার চেয়েছিল। কিন্তু প্রভাবশালী চক্র বিচার না করে উল্টো চাপ সৃষ্টি করে। এর জেরে ওই নারী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। পরে নিয়মিত আদালতে হত্যা ও ধর্ষণ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় ঘটনাটি। ঘটনার মূল হোতাদের গ্রেফতার করা হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নানা আইনি প্রতিবন্ধকতা ও সাক্ষী হাজির করার জটিলতায় মামলাটি এখনও নিম্ন আদালতে ঝুলছে।
২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের পাশে স্বামীকে আটকে রেখে এক বহিরাগত নারীকে গণধর্ষণ করা হয়। এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ও তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমানসহ মোট ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ‘ধানের শীষ’-এ ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে এক গৃহবধূর বাড়িতে হামলা চালিয়ে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে ঘরের বাইরে নিয়ে নৃশংসভাবে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও জখম করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের লোকজন। দীর্ঘ ৫ বছরের নিম্ন আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রুহুল আমিন ও সোহেলসহ ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। এই মামলাটিও বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় আট বছরের আছিয়া। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি। চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক আদালতে প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে রায়ও কার্যকর হয়নি। দেশজুড়ে আলোচিত এই ঘটনার পর তৎকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের আশ্বাস দেয়া হলেও বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতে থমকে আছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আছিয়ার পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। আছিয়ার মৃত্যুর পর মানসিক ভারসাম্যহীন তার বাবা ও অসহায় মায়ের জীবন একেবারেই মানবেতর। অত্যন্ত কষ্টে দিনাতিপাত করছেন তারা।
রায় আছে, কার্যকারিতা নেই
শুধু আলোচিত এসব ঘটনাই নয়। গত এক দশকে কোনো ধর্ষণের মামলারই বিচারের কুল কিনারা করা যায়নি। নিম্ন আদালত কিংবা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা হলেও ঝুলে আছে উচ্চ আদালত। হচ্ছে না আপিল নিষ্পত্তি। উচ্চ আদালত থেকে নিষ্পত্তি হয়ে রায়ের ঘোষণা হলেও কার্যকর হচ্ছে না রায়। বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষা করতে করতে ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলো দিশেহারা। মামলার পেছনে টাকা খরচ করতে করতে নিঃশ্ব হয়ে গেছেন অনেকে।
অপরাধের শিকার হলেও দ্রুত বিচার পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেক সময় অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে এখন পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে ও এককভাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মোট পাঁচজনের ফাঁসি হয়েছে। একই অপরাধে দেশের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় দেড়শ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী রয়েছেন। যাদের রায় এখনো কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্সসহ নানা জটিলতায় তাদের রায় কার্যকর করা যায়নি।
শাস্তি বাড়লেও বিচার এগোয় না
গত বছর যখন মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভে ফুসে উঠে। তার প্রেক্ষিতে ধর্ষণের মামলার বিচারে উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। আইন অনুযায়ী, একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করলে এবং উক্ত ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগী আহত বা নিহত হলে, অপরাধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। ধর্ষণের কারণে যদি ভুক্তভোগী নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীর একমাত্র এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং এর সাথে অনূর্ধ্ব ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড।
তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ধর্ষণ মামলার জট কমাতে শুধু শাস্তি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে দ্রুততা, সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেসব দুর্বলতা মামলার বিচারকে দীর্ঘায়িত করছে, সেগুলো কাটাতে বিভিন্ন দেশ বিশেষায়িত সহায়তা কাঠামো গড়ে তুলেছে। ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোতে এই প্রাতিষ্ঠানিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দেড় লক্ষাধিক মামলা, কম দণ্ডহার
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক পরিচালিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে যে, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ। আর প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।
এছাড়া হাইকোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল, যার মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন রয়েছে।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাত্র ১০১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে এবং প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে প্রায় ১,৫০০ মামলা বিচারাধীন।
বাংলাদেশের এই স্থবিরতার বিপরীতে প্রতিবেশী ভারত ধর্ষণ ও শিশু যৌন অপরাধ প্রতিরোধ আইনের আওতায় ফাস্ট ট্র্যাক স্পেশাল কোর্ট গঠন করে মামলার জট কমানোর চেষ্টা করেছে। ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৭৪৫টি ফাস্ট ট্র্যাক স্পেশাল কোর্ট কার্যকর ছিল, যার মধ্যে ৪০৪টি ছিল এক্সক্লুসিভ POCSO আদালত। এসব আদালত ৩ লাখের বেশি মামলা নিষ্পত্তি করেছে। তবে ভারতের অভিজ্ঞতাও বলে, দ্রুত নিষ্পত্তি বাড়লেও দণ্ডহার, সাক্ষীর নিরাপত্তা ও রাজ্যভেদে বিচারমানের প্রশ্ন থেকে যায়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক দি ইনসাইটাকে বলেন, অপরাধের পর দ্রুত ও ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা কমে গেছে। অনেকেই মনে করেন, অপরাধের শিকার হলেও দ্রুত বিচার পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেক সময় অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়। এমন ধারণা সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে।
দুর্বল তদন্ত, অনিরাপদ সাক্ষী
আইনজীবীরা বলছেন, ধর্ষণ মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আসামিদের খালাস পেয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ মূলত- দুর্বল তদন্ত, আইনি জটিলতা, সাক্ষীর অভাব এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ গবেষণা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে প্রায় ৭০ থেকে ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি খালাস পেয়ে যায়। ঘটনার পর দ্রুত ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়া এবং পুলিশের অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে আদালতে উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক আলামত উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না। এছাড়া, দেশে সুনির্দিষ্ট ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ না থাকায় আসামিপক্ষের ভয়ভীতি, হুমকি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে প্রধান সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে অপরাধীরা সন্দেহের সুবিধা (Benefit of doubt) পেয়ে খালাস পেয়ে যায়।
এ ধরনের দুর্বলতা কাটাতে পাকিস্তান অ্যান্টি-রেপ ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ট্রায়াল অ্যাক্ট, ২০২১-এর অধীনে অ্যান্টি-রেপ ক্রাইসিস সেল গঠনের উদ্যোগ নেয়, যেখানে ভুক্তভোগীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মানসিক সহায়তা ও গোপনীয়তা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে মামলার জট কতটা কমেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো সীমিত। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সেক্সুয়াল অফেন্সেস কোর্টস মডেলে বিশেষ প্রশিক্ষিত আদালতকর্মী, ভুক্তভোগীবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যবস্থা এবং সেকেন্ডারি ভিক্টিমাইজেশন কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিচারকের সংকট এবং বারবার শুনানির তারিখ পিছানোর কারণে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর লেগে যায়। যা ভুক্তভোগী পরিবারকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। উন্মুক্ত আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের আপত্তিকর জেরা এবং সমাজের ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই মাঝপথে আইনি লড়াই ছেড়ে দেন। চূড়ান্তভাবে, বিচারহীনতার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বাধ্য হয়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার শেষ পর্যন্ত আদালতের বাইরে আসামিপক্ষের সাথে আপস বা আর্থিক মীমাংসা করে ফেলে। ফলে সামগ্রিকভাবে আসামিদের খালাস পাওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলছেন, মূলত ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্রমাগত বৃদ্ধির পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন আসামীরা আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন সমাজে অপরাধীদের মধ্যে আইন ভাঙার ব্যাপারে এক ধরনের চরম দুঃসাহস ও দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়। এই বিচারহীনতা একদিকে যেমন নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে ও অপরাধের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনি লড়াইয়ের প্রতি চরম আশাহত করে তোলে।
জাতীয় নারী শক্তি’র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দি ইনসাইটাকে বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ তৈরি করতে পারি নাই আমরা। ধর্ষণের মত নৃশংস ঘটনার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের নাম জানি তনু, আছিয়া, হিরামনি, রামিসা। কতজন নরপিশাচ অপরাধীদের নাম জানি? তাদের শাস্তির খবর রাখি? বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের এই সমন্বিত ব্যর্থতার জন্য দায়ী।
একের পর এক বিচারহীনতার কারণে সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত ছোট্ট রামিসা। রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা ও শিরশ্ছেদ করে প্রতিবেশী সোহেল রানা। তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয় দ্রুত চার্জশিট দাখিল ও ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির আশ্বাস দিয়েছে।
এসব আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত করতে হলে শুধু আইন সংশোধন নয়, মামলার প্রতিটি ধাপকে সময়সীমাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। বিশেষায়িত আদালতের সংখ্যা বাড়ানো, বিচারক ও প্রসিকিউটরদের প্রশিক্ষণ, দ্রুত ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষী সুরক্ষা আইন, ভুক্তভোগীবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ কক্ষ এবং ডিজিটাল কেইস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ছাড়া ১৮০ দিনের আইনি সময়সীমা বাস্তবে কার্যকর করা কঠিন।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস.এম ইউনুস আলী রবি দি ইনসাইটাকে বলেন, মাত্র অল্প কয়েকদিন হলো, বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ইতিমধ্যে বিচারকার্যে গতি আনা এবং মামলার জট কমানো ও দ্রুত নিষ্পত্তি জন্য নানান উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য লোকবল নিয়োগ, পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত শেষ করা ও বিচার কাজে সাক্ষ্য গ্রহণে বিলম্ব না করা। সাক্ষ্য গ্রহণে অপ্রয়োজনীয় সময় না দেয়া এবং প্রসিকিউশন মামলার মনোনীত সাক্ষীদের সময়মত আদালতে উপস্থিত করাতে পারলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হবে এবং বিচারকাজে গতি আসবে। তাছাড়া মিথ্যে ও হয়রানিমূলক মামলা কমানো গেলে মামলার জট আরো কমে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এসব উদ্যোগ কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে ধর্ষণ মামলার জট কমবে না; দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা, দক্ষ প্রসিকিউশন এবং উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তির বাস্তব অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত বিচারহীনতার এই চক্র ভাঙতে পারে।




